ব্যক্তিগত গাড়িটি পরীমণি মাদক পরিবহনে ব্যবহার করতেন: সিআইডি

নজর২৪ ডেস্ক- ঢাকাই সিনেমার আলোচিত নায়িকা শামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমণি বিদেশি মদ সেবনের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স (পারমিট) নিয়েছিলেন, তবে করোনার মধ্যে গত বছরের ৩০ জুন পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি আর মাদক সেবনের পারমিট নবায়ন করেননি। একই সাথে, পরীমণি নিজের ব্যক্তিগত হ্যারিয়ার গাড়িটি মাদক পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতেন বলে আদালতে অভিযোগপত্রে জানিয়েছে সিআইডি।

 

তবে, তাকে গ্রেপ্তারের শুরুতে তিনি নিয়মিত মদ সেবন করতেন বলে অভিযোগ করা হলেও মামলার তদন্তে তিনি আসলেই নিয়মিত মাদক সেবন করতেন কিনা তা নিশ্চিত করতে কোন নারকোটিক্স পরীক্ষা করা হয়নি।

 

একই সাথে মামলায় পরীমনি প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজের কাছ থেকে মদ সংগ্রহ করতেন বলে র‍্যাব দাবি করলেও অভিযোগপত্রে তার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। তবে, শুরু থেকেই পরীমনির আইনজীবীরা বলে আসছেন র‍্যাব মূলত বনানীর বাসা থেকে খালি বোতল জব্দ করেছিল, যেখানে কোন মদ ছিল না।

 

পরীমণির আইনজীবী নীলাজ্ঞনা রিফাত বলেন, ‘পরীমণির শখ ছিল মদের খালি বোতল সংগ্রহ করা। তিনি শখের বশেই এগুলো বাসায় এনে রেখেছিলেন।’

 

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‍্যাব)-এর করা মাদক মামলায় চিত্রনায়িকা পরীমনি ও তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে আদালতে সোমবার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলা হওয়ার দুই মাসের মাথায় গত সোমবার বিকেলে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের সাধারণ নিবন্ধন (জিআর) শাখায় এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।

 

অভিযোগপত্র থেকে জানা গেছে মামলার অন্য দুই আসামি আশরাফুল ইসলাম দিপু ও কবির হোসেনকেও অভিযোগপত্রে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১০(ক), ২৪(খ), ২৯(ক), ৩৮ ও ৪২(১) ধারায় অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেছেন পরীমনির মামলার সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ইনস্পেক্টর কাজী গোলাম মোস্তফা ।

 

অভিযোগপত্রে যা আছে

মামলার অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা কাজী গোলাম মোস্তফা বলেন, মামলরা তদন্তভার গ্রহণ করে তিনি মামলার ডকেট (কেস ডকুমেন্টস) পেয়ে আসামিদের জিজ্ঞাবাদ শুরু করেন। ঘটনাস্থল বনানীর বাড়িটি সরেজমিনে পরিদর্শন করলেও আগের তদন্ত কর্মকর্তাদের খসড়া-মানচিত্র ও সূচিপত্র সন্তোষজনক মনে করে নিজে থেকে করার প্রয়োজন মনে করেননি।

 

সিআইডির কাছে মামলা তদন্তে থাকা অবস্থায় আরও একজন আসামি কবির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিদের আরেক দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তা, একই সাথে জব্দ করা মাদক দ্রব্য রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সিআইডি’র কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠান।

 

অভিযোগপত্রে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, পরীমনিসহ অন্যদের মাদকের লাইসেন্স (পারমিট) আছে কিনা সে বিষয়ে জিজ্ঞাসবাদ করেন তিনি। রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পেয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেন তিনি। পরীমনিসহ বাকি দুই আসামিদের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যের মজুদ, সংরক্ষণ ও সংগ্রহের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা এসব মাদক বাদি দুই আসামি আশরাফুল ইসলাম ও কবির হোসেনর সহায়তায় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ক্রয় করে উক্ত মাদকদ্রব্য পরীমনি নিজের বাসায় মজুদ রেখেছেন বলে স্বীকার করেছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

 

এছাড়া পরীমনি তার ব্যবহার করা হ্যারিয়ার প্রাইভেট গাড়িটি মাদক পরিবহনের কাছে ব্যবহার করতেন বলে দাবি করেছে সিআইডি। তবে, পরীমনি ১৩ জানুয়ারি ২০২০ সাল থেকে ৩০ জুন ২০২০ সাল পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে বিদেশি মদ সেবনের একটি লাইসেন্স (পারমিট) গ্রহণ করেন, কিন্তু পরে মাদক সেবনের পারমিটটি আর নবায়ন করেননি, যেটি এর মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

 

মামলার জব্দ করা আলামত রাসায়নিক পরীক্ষা করে জানা যায়, সাতটি প্লাস্টিকের মদের বোতলে অ্যালকোহলের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ১৪.২%, ১২.৩%, ১২.৬%, ১১.৭%, ১২.১%, ১৫.২% ও ১১.২%।

 

কাগজের প্যাকেটে রক্ষিত দানাদার পদার্থে মেথামেটাফিন; এবং ব্লটার পেপারে এলএসডি পাওয়া যায়।

 

মামলাটির সার্বিক তদন্তে ও সাক্ষ্যপ্রমাণে মামলার এজাহার নামীয় আসামি শামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমণি (৩১), আশরাফুল ইসলাম দিপু (২৯) ও মো. কবির হোসেন জমদ্দার (৫৫) আসামিরা অবৈধভাবে মাদকদ্রব্য এলএসডি, আইস ও মাদক সেবনের উপকরণ পাইপ ক্রয় করে নিজ বাসায় সংরক্ষণ, মজুদ, দখল ও নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং মাদক পরিবহনে গাড়ি ব্যবহার ও সহায়তা করেন বলে উল্লেখ করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ১০(ক), ২৪(খ), ২৯(ক), ৩৮ ও ৪২(১) ধারায় পরীমণি অপরাধ করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

 

তদন্তে অভিযুক্ত আসামিভিত্তিক পর্যালোচনা

পরীমনি অবৈধভাবে মদ, এলএসডি, আইস ও মাদক সেবনের উপকরণ বং পাইপ ক্রয় করে নিজের বনানীর বাসায় মজুদ, দখল ও নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি মাদক পরিবহনে ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ১০(ক), ২৪(খ), ২৯(ক), ৩৮ ও ৪২(১) ধারার অপরাধ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

 

আদালতে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরীমনির সাজা হতে পারে এক থেকে পাঁচ বছর।

 

আসামি মো. আশরাফুল ইসলাম দিপুর ক্ষেত্রেও অভিযোগপত্রে একই ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আরেক আসামি কবির হোসেন মাদকদ্রব্য সংগ্রহে সহযোগিতা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ৪১ ধারায় অপরাধ করেছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ৩১ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ মাদক মামলায় পরীমনির জামিন মঞ্জুর করেন। পরদিন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

 

গত ৪ আগস্ট রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমণি ও তার সহযোগী দীপুকে আটক করে র‍্যাব। এ সময় পরীমণির বাসায় বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া গেছে বলে জানায় র‍্যাব। পরদিন ৫ আগস্ট র‍্যাব-১ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরীমণি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করে।

 

এরপর ৩ দফায় মোট ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় পরীমণিকে। প্রথম দফায় ৫ আগস্ট ৪ দিন, দ্বিতীয় দফায় ১০ আগস্ট ২ দিন এবং ৩য় দফায় ১৯ আগস্ট ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয় তার। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *