নজর২৪ ডেস্ক- ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যে সাড়া ফেলে দেয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। মোটরসাইকেল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, পোশাক-আশাক, খাদ্য-পণ্যসহ যত ধরণের পণ্য তারা বিক্রি করছিলো তার প্রায় সব কিছুর বিপরীতে ব্যাপক ছাড় এবং লোভনীয় ক্যাশব্যাক অফার ছিলো। সংগে ছিলো দেশের নামী তারকাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করা, টিভি চ্যানেলসহ সব ধরণের গণমাধ্যমে দর্শনীয় বিজ্ঞাপনসহ দৃষ্টি আকর্ষণের সব চেষ্টাই।
কিন্তু শুরুর কিছুদিন পর থেকেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য ডেলিভারি দিতে না পারার অভিযোগ উঠতে শুরু করে ইভ্যালি’র বিরুদ্ধে। কিন্তু তারপরেও বড় বড় ছাড় আর বাজারমূল্যের অর্ধেক দামে পণ্য পেয়ে অনেক ক্রেতা খুশিও ছিলেন।
মাত্র তিন বছরে ইভ্যালি’র গ্রাহক সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। কিন্তুদের জাঁকজমক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রতিষ্ঠার তিন বছর পূরণ হবার আগেই অনেকটা ধসে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইভ্যালি’র ব্যবসায়িক মডেলের সংগে সাদৃশ্য রয়েছে এমন কোন মডেল বিশ্বে দীর্ঘ মেয়াদে সফল হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মুশতাক আহমদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইভ্যালি যেভাবে ব্যবসা করছিলো তাকে অ্যাকাডেমিক ভাষায় ‘পঞ্জি মডেল’ বলা হয়। এ মডেলে কম বিনিয়োগে অধিক মুনাফা লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে কিছু মানুষকে ছাড়, পুরষ্কার বা লভ্যাংশ দিয়ে মানুষের লোভ বা আকাঙ্ক্ষাকে জিইয়ে রাখা হয়।
এই ধরনের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নিজের বিনিয়োগ থাকে একেবারেই কম।
কীভাবে কাজ করে পঞ্জি স্কিম?
অধ্যাপক মুশতাক আহমদ বলছেন, ধরা যাক, আমি একটা খুব চটকদার বিজ্ঞাপন দিলাম যে এক লাখ টাকার মোটরসাইকেল পঞ্চাশ হাজার টাকায় দেবো। যারা গ্রাহক তারা কিন্তু এটা চিন্তা করে না যে এক লাখ টাকার মোটরসাইকেল কেমন করে পঞ্চাশ হাজার টাকায় দিচ্ছে।
“প্রথমে এরকম আট দশজনকে দিলো, এটার একটা মাল্টিপ্লাইড এফেক্ট আছে। আমি এরকম একটা পেলে আরও দশজনকে বলবো, ওরাও অ্যাপ্লাই করবে। তো টাকার ইনফ্লোটা কিন্তু অনেক হবে। প্রতিষ্ঠান তো আগে অ্যাডভান্স নিয়ে নিয়েছে টাকা, অ্যাডভান্স নিয়ে এখন পাঁচ বা দশ শতাংশ লোককে সে ডেলিভারি দিচ্ছে। কিন্তু ম্যাক্সিমাম লোক ডেলিভারি পাচ্ছে না। এই টাকাগুলোই তারা বাজারে রিভলভ করছে। আর দশজনের খবর শুনে আরও একশোজন অ্যাপ্লাই করছে, তারাও টাকা অ্যাডভান্স করছে—এই টাকা দিয়েই কোম্পানি প্রোডাক্ট কেনে এবং ডেলিভারি দেয়।
এভাবেই ব্যবসা করছিলো ইভ্যালি। এটাই ছিলো তাদের মডেল। কিন্তু অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ বলছেন, এটা সাস্টেইনেবল বা টেকসই কোনো মডেল না।
পঞ্জি স্কিমে যারা ব্যবসা করে, তাদের শর্ট-রান ভিশন থাকে যে মানুষের টাকায় ব্যবসা করে অল্প সময়ে কিছু টাকা বানিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া বা অন্যভাবে মার্কেট থেকে টাকা তুলে তারা চলে যাবে।
ইভ্যালি’র ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক নিয়মনীতির দৃশ্যমান ঘাটতি ছিলো না বলে মনে করেন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, ই-কমার্স ব্যবসায় যেহেতু বিক্রেতা এবং গ্রাহকের সামনাসামনি দেখা হয় না, সে কারণে এখানে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আস্থা এগুলোই মূল ভিত্তি।
তিনি বলেন, ইভ্যালি এবং এর মতো দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা হচ্ছে, সাধারণত পণ্যের মান ঠিক রাখা এবং সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া। আরেকটি বিষয় হচ্ছে পণ্য যদি পছন্দ না হয় বা ত্রুটি থাকে, তাহলে সেটি ফেরত দেওয়া—সেগুলোর ব্যবস্থা থাকতে হয়।
“আরেকটি হচ্ছে টাকা দেওয়ার পর পণ্য ডেলিভারি না দেওয়া, সেটা প্রতিকারও থাকতে হবে। এগুলো ইভ্যালিতে দেখা যায়নি। ফলে ব্যবসার যে সাধারণ নীতিমালা ও জবাবদিহিতা জনিত নৈতিকতা সেগুলো এখানে মানা হচ্ছিলো না।”
ইভ্যালিতে অর্ডার করা পণ্য সময়মতো না পেলে কিংবা একেবারেই না পেলে গ্রাহক কোথাও গিয়ে অভিযোগ করার মতো ব্যবস্থাও ছিলো না। কিন্তু অ্যামাজনের মতো বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্ডার করা পণ্য সময় মতো না পেলে, কবে আসবে সেটি জানানোর এবং অভিযোগ জানাবার জন্য কার্যকর যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকে।
বকেয়া ফেরতের কী ব্যবস্থা হবে?
ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলে গ্রাহক এবং মার্চেন্ট অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য নিয়ে গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে- উভয়ের কাছে ব্যাপক দেনা হয়েছে ইভ্যালি’র। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, অগাস্টে মন্ত্রণালয়কে ইভ্যালি’র দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৫ জুলাই পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির দেনা ৩১১ কোটি টাকা। আর মার্চেন্টদের কাছে দেনা ২০৫ কোটি টাকা।
এমন অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছেন ইভ্যালি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মো. রাসেল এবং চেয়ারম্যান (তার স্ত্রী) শামীমা নাসরিন। প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষ নির্বাহী গ্রেপ্তার হওয়ায় গ্রাহক ও মার্চেন্টরা নিজেদের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর ধানমণ্ডিতে ইভ্যালি’র প্রধান কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
তবু গ্রাহক ও মার্চেন্টদের একটি অংশ প্রায় প্রতিদিনই ইভ্যালি অফিসের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছেন। তারা মোঃ রাসেলের মুক্তি চান। তাঁরা মনে করছেন, কোম্পানির শীর্ষ ব্যক্তিরা কারাগারে থাকলে তাঁরা অর্থ ফেরত পাবেন না।
গত বুধবার ইভ্যালি ইস্যুতে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। সেখানেও ইভ্যালি’র পাওনাদারদের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে পরিষ্কার কোনো বক্তব্য আসেনি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন ইভ্যালি’র দায়িত্ব নিতে না চাইলেও, মূলত তাদের উদাসীনতার সুযোগ নিয়েই এই ধরণের আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটছে।
