নজর২৪ ডেস্ক: আলোচিত কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়াকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছিল বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে। এই মামলায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ার দাবি করে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে জমা দেয়া হয়।
এর পরপরই এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন মুনিয়ার বোন ও মামলার বাদী নুসরাত জাহান তানিয়া। পুলিশের এই প্রতিবেদনের ওপর নারাজি দেয়ার কথা জানিয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, মামলা থেকে একমাত্র অভিযুক্ত আনভীরকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন করাটা অন্যায়। এর বিরুদ্ধে আদালতে যাব, নারাজি বা অনাস্থা দেবে।
আনভীরকে অব্যাহতি দেয়া হলে দেশে অন্যায়ের বিচার হবে কী করে- এমন প্রশ্ন রেখে নুসরাত জাহান বলেন, মাস দেড়েক আগে পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এডিসি নাজমুল সাহেবের সাথে কথা হয়। তারপর অনেকবার ফোন করা হলেও সাড়া দেয়নি পুলিশ। এতে ‘একটা কিছু হতে যাচ্ছে’ বুঝতে পারার মধ্যেই আজ এই খবর পেলাম।
পুলিশ শুরুতেই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এখন সেই পুলিশই জড়িত থাকার পরে আনভীরকে অব্যাহতি দেয়ার কথা বলছে। কেন এমনটি হচ্ছে, বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি।
প্রতিবেদনটি গ্রহণ করা না করার বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ২৯ জুলাই দিন ধার্য করেছেন আদালত। সেদিন আদালতে গিয়ে নারাজি দেয়ার কথা জানিয়েছেন মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান। তবে এ নিয়ে আনভীরের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি। আজ ডিএমপির গুলশানের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, এই মামলায় তারা আনভীরকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেন ১৯ জুলাই।
চলতি বছরের গত ২৬ এপ্রিল রাতে রাজধানীর গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি মিরপুর ক্যান্টমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে আনভীরকে আসামি করে গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, বছর দুয়েক হলো সায়েম সোবহান আনভীরের (৪২) সাথে মুনিয়ার পরিচয়, প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাদের মধ্যে। ২০১৯ সালে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রাজধানীর বনানীতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন এবং বসবাস শুরু করেন। ২০২০ সালে বিষয়টি সায়েমের পরিবার জানতে পারলে তার মা মোসারাতকে ঢাকা ছাড়তে ভয়ভীতি দেখান।
গুলশানের ওই ফ্লাটটি ভাড়া নিতে বাদী নুসরাত দম্পতির জাতীয় পরিচয়পত্র নেন আসামি সায়েম সোবহান তানভীর। ফুসলিয়ে মোসারাতকে ঢাকায় আনেন তিনি। গত ১ মার্চ থেকে ফ্লাটটিতে আসা-যাওয়া করতেন আসামি। এজাহারে আরো বলা হয়, গত ২৩ এপ্রিল মোসারাত বাদীকে ফোন করে জানান, ফ্লাটের মালিকের বাসায় ইফতার করা এবং ছবি তোলায় আনভীর তাকে বকাঝকা করেছেন। ওই ছবি ফ্ল্যাটের মালিকের স্ত্রী ফেসবুকে পোস্ট করায় দেখেছেন ফ্ল্যাট মালিকের স্ত্রীর বান্ধবী পিয়াসা। তিনি তানভীরের মাকে সব বলে দেবেন।
আসামি দুবাই চলে যাচ্ছেন জানিয়ে মোসারাতকে বলেছেন, তিনি যেন দ্রুত কুমিল্লায় ফিরে যায়। তাহলে তার মা জানতে পারলে মোসারাতকে মেরে ফেলবে। ২৫ এপ্রিল মোসারাত ফোন করে বাদীকে জানান, আনভীর তাকে ‘শুধু ভোগ করা’ এবং বিয়ে না করার কথা বলেছেন। শত্রুর সঙ্গে দেখা করায় মোসারাতকে ছাড়বেন না বলে আসামি হুমকি দিয়েছেন। আসামি ধোঁকা দিয়েছেন উল্লেখ করে মোসারাত যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কার কথা জানিয়ে পরিবারকে দ্রুত ঢাকায় আসতে বলেন।
ঘটনার দিনের বর্ণনায় এজহারে বলা হয়, ফোন পাওয়ার পর আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বেলা দুইটা নাগাদ ঢাকায় রওনা দেন মামলার বাদী নুসরাত। এরপর থেকে মোসারাতকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। গুলশানের বাসায় পৌঁছে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পেয়ে নিরাপত্তারক্ষীর কক্ষ থেকে বাসার ইন্টারকমে ফোন করা হয়। সাড়া না পেয়ে ফ্ল্যাট মালিককে জানালে তিনি মিস্ত্রি এনে তালা ভাঙার পরামর্শ দেন। পরে মিস্ত্রির মাধ্যমে তালা ভেঙে বাসায় ঢুকে শোয়ার ঘরের সিলিংয়ে ওড়নায় ঝুলতে দেখেন মোসারাতকে।
পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে ওড়না কেটে তার মৃতদেহটি নামায়। এ সময় আসামির সঙ্গে তোলা ছবি, প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে লেখা ডায়েরি ও দুটি মুঠোফোন উদ্ধার করে নিয়ে যায় পুলিশ। এ ছাড়া ওই বাসার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করা হয়। ওই তরুণীর আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধানে তদন্তে নামে পুলিশ। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৭ এপ্রিল আসামির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর হাকিম শহিদুল ইসলামের আদালত।
