লকডাউনে ৩ দিন না খেয়ে থেকে অভাবের সংসার থেকে বিষপানে বিদায় গৃহবধূর

নজর২৪ ডেস্ক- স্বামী সিএনজিচালক, কিন্তু চলমান কঠোর লকডাউনে গাড়ি চালাতে না পারায় তিনদিন ধরে ঘরে ছিল না খাবার। শেষে স্ত্রীর একজোড়া কানের দুল বন্ধক দিয়ে বাজারে গিয়ে কিনে এনেছিলেন খাবার। করোনাকালে সংসারের অভাব আর সামনের দিনগুলোর অনিশ্চয়তা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল লিপি আক্তারকে।

 

এরমধ্যে বাড়ির মালিক বলে দিয়েছিলেন, ১ তারিখের মধ্যে ঘরভাড়া না দিলে বের করে দেবেন সবাইকে। সেই ১ তারিখ আসার আগেই লিপি নিজেই বের হয়ে গেলেন দুনিয়া থেকে— এক বোতল বিষপান করে।

 

মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) দুপুরে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনাই ঘটেছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার কাঠগড় বাজারের পাশে বাদশা মিয়ার কলোনিতে।

 

দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে নিজ বাসায় বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন লিপি আক্তার। ঘটনা জেনে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক লিপিকে মৃত ঘোষণা করেন।

 

পতেঙ্গা থানাধীন কাঠগড় বাজারের পাশে বাদশা মিয়ার কলোনিতে ভাড়া থাকতেন তারা। লিপির গ্রামের বাড়ি হাতিয়ায়।

 

জানা গেছে, লিপি আক্তারের স্বামী আমজাদ হোসেন (৩২) পেশায় সিএনজিচালক। লকডাউনে গাড়ি চালাতে না পারায় তিনদিন তাদের ঘরে কোনো খাবার ছিল না। মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) সকালে স্ত্রীর এক জোড়া কানের দুল বন্ধক দিয়ে খাবার কিনে এনেছিলেন স্বামী আমজাদ। বৃহস্পতিবার থেকে গাড়ি চলার কথা, তাই স্ত্রীর আগের ঘরের ছেলে হৃদয়কে (৯) নিয়ে গ্যারেজে গিয়েছিলেন গাড়ি পরিস্কার করতে। কিন্তু তারা ফিরে আসার আগেই বিষপান করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন লিপি আক্তার।

 

লিপির স্বামী আমজাদ মুঠোফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘অভাবের সংসারের অনিশ্চয়তা নিয়ে লিপি আক্তার সবসময় চিন্তায় থাকতেন। ঘরভাড়া বাকি পড়েছিল ৬ হাজার টাকা। বাড়ির মালিক বলে দিয়েছিলেন, আগামী ১ তারিখের মধ্যে টাকা না দিলে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হবে। এজন্য প্রতিদিনই গার্মেন্টসে চাকরির খোঁজ করতে যেত লিপি। চাকরি না পেয়ে বৃষ্টির পানিতে ভিজে ভিজে বাড়ি চলে আসত। মনের দুঃখেই জীবনটা শেষ করে দিল সে।’

 

আমজাদ জানান, এক বছর আগে লিপির সাথে তার বিয়ে হয়। তার আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল। পরে ওই স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আগের সেই ঘরের ৯ বছরের ছেলে হৃদয়কে নিয়ে তারা থাকতেন। হৃদয় স্কুলে পড়তো। নিজের ছেলের মতোই আদর যত্ন করেন হৃদয়কে।

 

আমজাদ আরও বলেন, ‘গয়না বন্ধক, চাকরি না পাওয়া, বাড়ির জমিদারের কথা শুনে ক্ষোভে-দুঃখেই বিষ খেয়েছে লিপি। অভাব তো সারাজীবন থাকত না। কেন এমন করল আমার স্ত্রী?’

 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শীলব্রত বড়ুয়া জানান, বিষপানের পর আশংকাজনক অবস্থায় লিপি আক্তারকে হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান লিপি আক্তার অনেক আগেই মারা গেছেন। লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

 

এদিকে আমজাদ হোসেনের বাড়ির জমিদার বাদশা মিয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ‘আমি এক তারিখের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলিনি। তবে লকডাউনের পর বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলাম মনে হয়। সঠিক আমার মনে নেই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *