আমার কণ্ঠস্বর চোরের মতো কেন হবে?: সায়ান

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান একটি আলোচিত নাম। ভিন্ন ধরনের গান গেয়ে মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। শব্দ-সুরে যিনি দেশ, রাজনীতি ও জীবনের চেনা-অচেনা গলির গল্প তুলে ধরেন। সেগুলোকে কিছু মানুষ বলে ‘জীবনমুখী গান’, কারও কাছে আবার ‘প্রতিবাদী বা সাহসী গান’। যদিও স্বাধীনচেতা এই শিল্পীর কাছে গান শুধুই তার অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম।

সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সায়ান জানিয়েছেন তার বর্তমান ব্যস্ততার কথা। বলেন, বেশি ব্যস্ততা আমি পছন্দ করি না। তাই বেশি ব্যস্ততা রাখিও না। তবে কাজ আছে। এর মধ্যে প্রতিদিনই একটা বড় সময় থাকে, যখন কিছুই করি না; নিজের মতো থাকি। হাঁটতে যাই, গান শুনি, বই পড়ি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ মানুষ দেখি। বন্ধুদের সঙ্গে, ফ্যামিলির সঙ্গে সময় কাটে, সিনেমা দেখি; এই তো।

সায়ান যেমন বিদ্রোহী, তেমনই কি একাকীত্ব আর বিরহ বিলাসী? অনেক গানেই সেই ছাপ লক্ষ্য করা যায়। এর পেছনে কোনও ব্যাখ্যা আছে কি?

তিনি বলেন, আমি আপনার মতোই একজন মানুষ, যার মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করবে প্রতিবাদ করতে, যার ভেতরে রাগ হবে, দুঃখ হবে, মানুষ তাকে কষ্ট দিলে ব্যথা লাগবে, তার মাঝেমধ্যে একা লাগবে, মাঝেমধ্যে বন্ধুদের দরকার হবে, কারও সঙ্গে দেখা করতে চাইবে; অনুভূতির জায়গা থেকে আপনার সঙ্গে আমার কোনও পার্থক্য নাই। এখন আমার অনুভূতিটা আমি প্রকাশ করি গান দিয়ে। যখন রেগে থাকি, তখন প্রতিবাদের গান করি, যখন দুঃখে থাকি, তখন গান হয় বেদনার। বাইরের মানুষ আমাকে ক্যাটাগরাইজ করছেন, কেউ বলছেন, ‘এই মেয়েটা শুধু প্রতিবাদের গান করে’; আমি সেটা বলছি না। আমি বলছি, আমার অনুভূতিকে গানে প্রকাশ করি।

বাস্তুহারা, ফুটপাতে পড়ে থাকা মানুষকে দেখে আপনি ‘তাজ্জব’ বনে গেছেন, জনতা হিসেবে সরকারের সঙ্গে ‘বেয়াদবি’ করেছেন; গানের মধ্যে রাজনৈতিক বাস্তবতার এই সাহসী ভাষা কীভাবে এসেছে? সেটা অনুপ্রেরণা হতে পারে আবার সমাজ ব্যবস্থাও হতে পারে।

সায়ান বলেন, এটা অনেক সাহসের ব্যাপার, আমার কখনও মনেই হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি বাংলাদেশের জনতা, এটা আমার দেশ, অনেক যুদ্ধ করে পাওয়া দেশ। আমার ধারণা ছিলো, আমি শক্তিশালী জনতা, আমি দেশের মালিক। এখনও তাই মনে করি। আমার কণ্ঠস্বর চোরের মতো কেন হবে? আমার দেশ নিয়ে আমি স্বাভাবিক সুরে কথা বলবো, এই স্বাভাবিক সুরটাকেই মানুষ বলছে সাহস! এটা দুঃখের ব্যাপার।

এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অবক্ষয় যে, একটা সাধারণ প্রশ্ন করাকে মানুষ মনে করে সাহস। এখানে তো সাহসের জায়গা দেখি না। ভয়টাকে সাধারণ করে ফেলা হয় কেন? সারাক্ষণ সরকারকে ভয় পেতে হবে কেন? সরকার হলো তোমার দায়িত্ব নেওয়া একটা প্রতিষ্ঠান, সে তোমার নির্বাচিত। যেকোনও সরকারের লজ্জিত হওয়া উচিত যে, তার জনগণ তাকে ভয় পায়!

কখনও কি মনে হয়, সংগীত জগত বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যতটা সাড়া পাওয়ার কথা, ততটা পাননি? অর্থাৎ প্রাপ্তি নিয়ে আপনার কোনও আক্ষেপ আছে কিনা?

সায়ান বলেন, একদমই না। কারণ গানকে যখন পণ্য হিসেবে দেখবেন, এটার একটা বাজার আছে। সেই বাজারটাকে কিছু মানুষ চালায়। তখন এটাকে বাস্তব দৃষ্টিতে দেখতে হবে যে, এই বাজারটা আসলে কেমন। আপনি কখনও ভারতের সঙ্গে এ দেশের তুলনা করতে পারবেন না; ওখানে একজন পপ সিঙ্গার গান গেয়ে যেমন সংসার চালাতে পারে, আবার যিনি রাগ-শাস্ত্রীয় গান করেন, তিনিও পারেন। ওদের ইন্ডাস্ট্রি অনেক ম্যাচিওর। আমি বাংলাদেশের মাটিতে যখন গান গাইতে চাই, আমাকে বুঝতে হবে এই বাজারটার ইতিহাস কী। আমি কেন তার কাছে আশা করবো যে, আমাকে সে মাথায় তুলে রাখবে। যদি আমি এই আশা করি, তাহলে এটা আমার বোকামি। আমাদের এখানে এরকম গানের বাজারই নেই। যেখানে আমি সরকারের সঙ্গে কথাবার্তা বলবো, দরদাম করবো, নাগরিক হিসেবে কড়া সমালোচনা করবো। এই সংস্কৃতি আমাদের সংগীতাঙ্গনে কোনোদিন ছিলো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *