প্রতারণার উদ্দেশ্য নিয়েই ইভ্যালি প্রতিষ্ঠা করে রাসেল: মানিক

আলোচিত-সমালোচিত ইকমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালি প্রতিষ্ঠার পেছনে কোম্পানিটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলের অসৎ উদ্দেশ্য ছিল বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির সদ্য পদত্যাগ করা পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

বিচারপতি মানিক একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘রাসেল অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই ইভ্যালি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজের খুশিমতো কোম্পানি চালিয়েছেন। কোম্পানির টাকায় বিলাসী জীবন যাপন করেছেন।’

বুধবার বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বাধীন ইভ্যালির পাঁচ সদস্যের পরিচালনা বোর্ড পদত্যাগ করেছেন। ইভ্যালির নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও ইভ্যালির বিষয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনও উচ্চ আদালতে দাখিল করেছেন তারা।

বেলা ১১টার দিকে তাদের পদত্যাগপত্র এবং প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয় বলে জানিয়েছেন বিচারপতি মানিক। বলেন, ‘ইভ্যালির বিষয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট আকারে জমা দিয়েছি।’

বিচারপতি মানিক বলেন, ‘ইভ্যালি বোর্ড গঠনের সময় আদালতের নির্দেশ ছিল আমাদের কাজ শেষ হবে অডিট রিপোর্ট পর্যন্ত। অর্থাৎ, অডিট রিপোর্ট শেষ হলে এবং তদন্ত রিপোর্ট শেষ হলে এরপর ইভ্যালীতে আমাদের আর কোনো কাজ নেই। আজকে আমরা অডিট রিপোর্ট এবং তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছি। এজন্য আমরা পদত্যাগ করলাম।’

ইভ্যালি নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিচারপতি মানিক বলেন, ‘আমরা তদন্ত রিপোর্টে লিখেছি—ইভ্যালিকে ডুবিয়েছে রাসেল। কারণ তার প্রথম থেকেই উদ্দেশ্যে ছিল প্রতারণামূলক। প্রতারণার উদ্দেশ্য নিয়ে সে এই কোম্পানি গঠন করেছে, মানুষকে ফাঁকি দিয়ে। মানুষকে ভুল বুঝিয়ে, মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে টাকাপয়সা আত্মসাৎ করেছে।’

‘সারা বছরই রাসেল তাই করেছে। আর ইভ্যালীর ইনভয়েসে উল্লেখ নেই—তাকে কে কত টাকা দিল; শুধু উল্লেখ আছে টাকার কথা। কে পেল সেই টাকা সেটা উল্লেখ নেই। এমনটি অডিটর সাহেবরা উল্লেখ করেছেন।’

বিচারপতি মানিক বলেন, ‘ইভ্যালিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে কিন্তু সেই টাকা গেল কোথায়? সেই টাকার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এ থেকে আমরা মনে করতে পারি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে; মানিলন্ডারিং হয়েছে। সেটা তদন্ত করবে সরকার। আমরা না।’

রাসেল এককভাবেই কোম্পানি চালাতো জানিয়ে বিচারপতি মানিক বলেন, ‘কোম্পানির অন্য সবাই আমাদের বলেছেন রাসেল এককভাবে কোম্পানি চালাতেন। কারও প্রতি রাসেলের দায়বদ্ধতা ছিল না। ভালো অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বা অ্যাকাউন্টেন্ট ছিল না।’

‘রাসেল কোনো বিধিবিধান মানত না। এসব না মেনেই নিজের মতো প্রতিষ্ঠান চালাত। কারণ তার উদ্দেশ্য ছিল পয়সা পকেটে ভরা। এবং সেটাই সে করেছে। এতে অনেকে প্রতারিত হয়ে পথে বসেছে। এজন্য কোম্পানিটি ডুবে গেছে।’

এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের অন্য সদস্যরা ছিলেন- স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ রেজাউল আহসান, অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফখরুদ্দিন আহম্মেদ এবং কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ।

এর আগে ইভ্যালির সাবেক চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন এবং তার মা ও বোন জামাইকে নতুন পরিচালনা বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এতে আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বোর্ডের মিটিংয়ে তাদের নতুন পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়।

পরিচালনা পর্ষদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নিচে নয় এমন কর্মকর্তাকে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া নতুন বোর্ডে ই-ক্যাবের একজন প্রতিনিধি থাকবেন। গত ২৪ আগস্ট বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে আদেশ দেন।

গত বছরের ১৮ অক্টোবর ইভ্যালি পরিচালনার জন্য আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করে দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বোর্ড গঠন করেন।

প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আরিফ বাকের নামের এক গ্রাহক গুলশান থানায় ইভ্যালির মো. রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরদিন বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

গত ২১ এপ্রিল চেক প্রতারণার ৯ মামলায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাসেলকে জামিন দেন আদালত। ওই দিন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পান তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে আরও মামলা থাকায় কারামুক্ত হতে পারেননি রাসেল। শামীমা নাসরিন বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *