এদের রেখে পালাতে চাই না: তাশরীফ

ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল। সিলেট ও সুনামগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিসহ দিন পার করছেন। প্রতিনিয়ত বন্যার পানির উচ্চতা বেড়েই যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতোটাই প্রতিকূল যে, পর্যাপ্ত সহযোগিতাও করতে পারছে না প্রশাসন।

এ অবস্থায় বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ‘কুঁড়েঘর’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় তরুণ সংগীতশিল্পী তাশরীফ খান।

এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে তিনি জানান, ‘দুই দিনে ১৬ লক্ষ টাকা অনুদান এসেছে। আমাদের সব নম্বরের লিমিট শেষ। এখন কেউ টাকা পাঠিয়েন না। আমরা এইটা ডিস্ট্রিবিউট করার পর প্রয়োজন হলে আবার জানাব।’

জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই সিলেটে অবস্থান করছেন তাশরীফ। সহযোগীদের নিয়ে বন্যা কবলিত মানুষদের সাহায্য করছেন। অন্যরাও যাতে এই সাহায্যে এগিয়ে আসে একারনে লাইভ করে সবাইকে জানাচ্ছেন। তার এই উদ্যোগ এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

সেখানে গিয়ে তিনি যে অবস্থা দেখেছেন তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপডেট দিচ্ছেন। সেখানকার অবস্থা দেখে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। যা নজরে এসেছে সবার। পাঠকের জন্য তা হুবহু প্রকাশ করা হলো।

“আজ সিলেটের কম্পানিগঞ্জ গিয়েছিলাম একজন অন্তসত্বা মহিলাকে উদ্ধার করার জন্যে। জানেন? এখানে কোন কোন নৌকা এক ঘন্টার জন্যে ৫০ হাজার এক লাখ টাকাও চাইছে। ওরাই বা কি করবে ওদের ত সব গেছে। যাবার পথে দেখলাম সেনাবাহিনীও নৌকার খোঁজ করছে ঘাটে বসে। হেল্প চাইলাম , উনারাও নিরুপায়। অনেক কষ্টে একজন মাঝির হাতে পায়ে ধরে রোগির কথা বলিয়ে রাজি করালাম। তবে মাঝি আস্তে আস্তে বলছিল ‘আমার ঘরের লোক গলা পানিতে ভাসতাসে আমি জাইতাম না’।

গ্রামের মানুষের মনটা হয় আকাশের চেয়ে বড়। রাজি হয়ে ঠিকি নিয়ে গেলেন আমাদের। কোনরকমে শ্রোত পার করে পৌছালাম সেই অন্তসত্বা মহিলার ঘরের দরজায়।

কোন নেটওয়ার্ক বা যোগাযগের ব্যাবস্থা ছিলনা।। উনার ছোট বোন আমাদের সাথে গিয়েছিল বাড়িটা ও চিনিয়ে দিল আমাদের।মেয়েটা ওর বড় বোনের চিন্তায় অনেকটা দম আটকে ছিল পুরো রাস্তা। গিয়ে শুনলাম অল্প কিছুখন আগেই উনারা অনেক কষ্টে আরেকটা নৌকা মেনেজ করে সিলেটের উদ্দ্যেশ্যে রউনা করেছেন।

পানিতে সব ডুবে যাওয়ায় ওদিকটা যোগাযোগ বিচ্ছিন তাই উনার খোঁজ ও নিতে পারছিলাম না। একদিকে উনাদের দুশ্চিতা আর অপর দিকে ভাবছিলাম এটা না মাত্র একটা কাহিনী । এরকম লক্ষ লক্ষ কাহিনীর উপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পার হচ্ছে সিলেট বাসীর দিন।

প্রায় ৩ ঘন্টা পর জানতে পারলাম সেই অন্তসত্বা ভদ্রমহিলা পৌছেছেন সিলেটে। শান্তির নিশ্বাস ফেলতে ফেলতেই অস্থিরতা শুরু হলো মনে যে কাল কয়টা পরিবারের কাছে খাবার পৌছাতে পারব? মোট দুই লক্ষের কিছু বেশি টাকা উঠেছে। যা দিয়ে ২০০ পরিবারের কাছে সামনের ৭ দিনের খাবার ত পৌছে দিতে পারব অন্তত।

কিন্তু তারপর? নৌকা নিয়ে যাবার পথে ডানে বামে যাদের দেখলাম ক্ষুদার্ত কাকের মত আমাদের দিকে চেয়েছিল এই বুঝি নৌকা থামিয়ে কিছু খাবার দেব!! তাদের দিকে তাকাব কোন মুখে? বিশ্বাস আছে হয়ত আরও কিছু অনুদান আসবে। এত তারাতারি সিলেট থেকে পালিয়ে যেতে চাই না আমি। কথাগুলো পড়ে নেহাত গল্প মনে হলে একটা বার এসে স্বচোক্ষে দেখে যান কিভাবে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে সব। খাবার ত দূরে থাক পানির কলের উপরে পানি উঠে যাওয়ায় পানি না খেয়েও দিন পার করছে কতশত মানুষ।

এদের রেখে পালাতে চাই না আমি। বাজার করা হচ্ছে। কাল কম্পানিগঞ্জ যাচ্ছি আমরা তাশরিফ স্কোয়াড। দোয়া কইরেন। সম্ভব হলে অনুদান পাঠিয়েন সাধ্যমত, কোন জোর নেই।”

এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি তাসরিফের মাধ্যমে বন্যার্ত সিলেটবাসীর সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন। এমন তথ্য জানিয়ে তাসরীফ লিখেছেন, ‘দুই দিনে ১৬ লাখ টাকা অনুদান এসেছে। আমাদের সব নাম্বারের লিমিট শেষ। এখন কেউ টাকা পাঠায়েন না। আমরা এইটা ডিস্ট্রিবিউট করার পর প্রয়োজন হলে আবার জানাব। হায়রে পানি! কখনো মানুষরে হাসায়, কখনো কাঁদায়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *