পুলিশ কনস্টেবল থেকে হাকিমের এএসপি হওয়ার গল্প পুরোটাই ভুয়া

এক কনস্টেবলের এএসপি হয়ে ওঠার খবরটি দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছে। দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারও হয় সে খবর। তার জীবন, সংগ্রাম, স্বপ্ন ইত্যাদি উঠে আসে গল্পের মতো। আর সেই গল্পের নায়কোচিত চরিত্র পুলিশ কনস্টেবল আব্দুল হাকিম।

ঘটনার মোড় ঘুরে যায় বেশ দ্রুতই। যখন জানা গেল, সেই কনস্টেবলের ৪০তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে ৬৭তম স্থান অর্জন করা বা এএসপি পদে তার সুপারিশপ্রাপ্তির ঘটনা পুরোটাই ভুয়া, তখন নয়া আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রথমে কনস্টেবল আব্দুল হাকিম সবার শুভেচ্ছা-সহানুভূতির কেন্দ্রে থাকলেও এখন তাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ওই কনস্টেবল কেন এমন করলেন বা প্রথম সারির মিডিয়াগুলোতে এমন খবর কোনো সত্যতা যাচাই ছাড়া কিভাবে প্রকাশ পায় ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. ফারুক হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আব্দুল হাকিম নামের ওই কনস্টেবল দাবি করেছেন যে, তিনি বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদের জন্য বাছাই হয়েছেন। তার এই দাবি ঠিক নয়, ভুয়া। আব্দুল হাকিমের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, সে মানসিক বিকারগ্রস্ত।

তিনি আরো বলেন, আমরা খবর নিচ্ছি, সে কেন এমন দাবি করল তা খতিয়ে দেখতে হবে। সে কেন এমন তথ্য মিডিয়াকে দিল! শেষ পর্যন্ত যদি প্রমাণ হয় যে এসব সত্যিই মিথ্যাচার, তবে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ৩০ মার্চ ৪০তম বিসিএসের ফল বের হয়। পরদিন রাতে ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার তথ্য জানান হাকিম উদ্দিন নিজেই। পরে জানা যায়, তাঁর এই তথ্য ছিল মিথ্যা। প্রকৃতপক্ষে পুলিশ ক্যাডারে মেধাতালিকায় ৬৭তম হয়েছেন সিলেটের সঞ্জীব দেব নামে এক ব্যক্তি। তাঁর রোল নম্বর ১৬০০৪৩৯১।

হাকিম উদ্দিন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়দাবাদ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ মিয়ার পঞ্চম সন্তান। ২০১০ সালে বাবা এবং ২০১৯ সালে মা মারা যান তাঁর। এক বোন ও পাঁচ ভাই তাঁরা। তিনি সবার ছোট। বড় দুই ভাই প্রবাসী, একজন ব্যবসায়ী এবং একজন চাকরিজীবী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাকিম উদ্দিন দুটি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দুতিন মাস আগে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী জমজ দুই সন্তান জন্ম দিয়েছেন।

তাঁর সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায় , হাকিম উদ্দিন ২০১০ সালে সায়দাবাদ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় মাধ্যমিক জিপিএ ৩ দশমিক ৬৩ পেয়ে পাস করেন। এরপর রায়পুরা কলেজ থেকে ২০১২ সালে মানবিক শাখায় উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ৩ পেয়ে পাস করে নরসিংদী সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২০১২-১৩ সেশনে ভর্তি হন। কিছুদিন পরই পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি হয় তাঁর।

২০১৩ সালে পুলিশে যোগ দেওয়ার প্রথম বছর গাজীপুর শিল্প পুলিশে কাজ করে বদলি হয় আসেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি)। নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে ২০১৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স শেষ করেছেন কি না তা নিশ্চিত করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

তবে পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার ফারুক হোসেন বলেছেন, ‘হাকিম ডিএমপির কেউ না। তিনি এক বছর আগে ডিএমপি থেকে বদলি হয়ে চলে গেছে। এখন কোথায় আছে বলতে পারব না।’

৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর হাকিম উদ্দিন সংবাদকর্মীদের জানিয়েছিলেন, কনস্টেবলের চাকরিতে সারা দিন কাজ করে বিশ্রামের সময় পড়াশোনা করতেন। যখন অনার্স চতুর্থ বর্ষের শেষ দিকে, তখন ভালো একটা চাকরির চিন্তা শুরু করেন। এই চিন্তা থেকেই কনস্টেবল পদে চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা করতে থাকেন।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতা পেয়েছেন উল্লেখ করে হাকিম বলেন, ‘আমার এ পরিশ্রমের পেছনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাহায্য করেছেন। প্রস্তুতি ভালো না থাকায় ৪০তম বিসিএসের আগে আবেদন করিনি। যখন মনে হয়েছে প্রতিযোগিতা করতে পারব, তখন আবেদন করি। তাই ৪০তমতে প্রথমবারের মতো বিসিএস পরীক্ষা দিই। ফল বেরোলে দেখি পুলিশ ক্যাডারে ৬৭তম হই।’

তব গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা যায়, হাকিমের এএসপি হওয়ার খবরটি পুরোপুরি ভুয়া। বিসিএসে উত্তীর্ণ তো দূরের কথা, বিসিএস পরীক্ষাই দেননি তিনি।

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) কর্তৃক প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, সিলেট অঞ্চল থেকে আবেদন করা সঞ্জীব দেব ৪০তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে ৬৭তম স্থান অর্জন করেছেন।

পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া সঞ্জীব শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। প্রথম বিসিএসেই পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। এমনকি তার প্রবেশপত্রেও ৪০তম বিসিএসে অংশগ্রহণ ও রোল নম্বরের সত্যতা পাওয়া গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুর্গম চরাঞ্চলে হাকিম উদ্দিনের এলাকায় গিয়ে তাঁকে নিয়ে শোনা যায় নানা গুঞ্জন। অনেকে বলেন, এলাকায় বিভিন্ন জনকে দেওয়ার কথা বলে প্রলোভন দেখিয়েছেন।

বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তাঁর ঘর তালাবদ্ধ। বাড়িতে বড় দুই ভাই স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকছেন। হাকিম উদ্দিনের বিষয়ে তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি।

হাকিমের ভাতিজা ইমান হাসান বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দীর্ঘ ছয় মাস আগে থেকে নেই। এই বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তাঁর সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়ায় মাধ্যমে জানতে পারি।’

প্রতিবেশী শহিদ মিয়া (৭০) জানান, হাকিম উদ্দিন ছোটবেলা থেকে খুব চঞ্চল। অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘তাঁর সফলতায় এলাকার সবাই আনন্দিত, গর্বিত ছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে আসতে দেখিনি। দ্বিতীয় স্ত্রীর জমজ সন্তান রয়েছে। তিনি দুটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী তালাকের পর দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে গত দুই-তিন মাস আগে জমজ দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে বলে শুনেছি। এখন এমন সংবাদে হাকিম সবার কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে গেলেন।’

সর্বশেষ আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত হাকিম উদ্দিনের সেলফোন নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *