নজর২৪, টাঙ্গাইল- বাবার স্বপ্ন ছিলো ছেলে ঠিক মতো পড়াশুনা করলে ভালো ডাক্তার বানাবেন, সেই ইচ্ছা থেকে এক মাত্র ছেলেকে ধলাপাড়া এস.ইউ.পি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার জন্য ছেলে আবু বক্কর কে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন বাবা শাহজালাল।
এবার সে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলের ইচ্ছা অনুযায়ী বাবা কোন কিছু চাওয়ার আগে দিয়ে দিতেন। গত বছর একটি মোটরসাইকেল চেয়েছিলেন ছেলে আবু বক্কর তাই বাবা টিভিএস আরটিআর মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। এক নির্মম দূর্ঘটনা কেড়ে নিলো একমাত্র সন্তানকে।
সেই মোটরসাইকেলই সোমবার (০৮ নভেম্বর) দুর্ঘটনায় মারা গেলো ছেলে আবু বক্কর। বাবার স্বপ্ন পূরন হলো না, অপূরণীয় হয়ে রইলো স্বপ্ন। একমাত্র ছেলে সকালে স্কুলে গিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে টিফিনের সময় মোটরসাইকেল নিয়ে স্কুলের বাহিরে বেড়াতে বের হোন পাশের বাড়ির ও একই ক্লাসের বন্ধু সায়েম ও শরীফের সাথে।
পথিমধ্যে ঘাটাইল ধলাপাড়া সড়কের চেয়ারম্যান বাড়ী মোড়ে বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে থাকা গাছের সাথে ধাক্কা খায় মোটরসাইকেল। দুমরে-মুচরে যায় মোটরসাইকেল। ঘটনাস্থলেই মারা যায় আবু বক্করসহ সাথে থাকা বন্ধু সায়েম ও শরীফ।
আশেপাশে থাকা লোকজন গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায় স্থানীয় একটি ক্লিনিকে পরে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
সাথে থাকা মৃত রমজান আলীর ছেলে সায়েম। পরিবারের দুই ভাইয়ের মধ্যে সায়েম ছোট বাবা মারা গেছেন ৫ বছর আগে এক মাত্র বড় ভাই ও মা ছিলো তার সব কিছু। সায়েমের বিদেশ যাওয়ার জন্য সকল প্রকার কাগজ জমা দিয়েছেন মা। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো।
অপরজন মৃত সমীর উদ্দীনের ছেলে শরীফ। শরীফের বাবা মারা গেছে এক বছর আগে ও মা মারা গেছে ২ বছর আগে বড় ভাই প্রবাস থেকে তার পড়াশুনার খরচ বহন করেন। তিনি থাকেন চাচার বাড়িতে।
শরীফের দুই বোন তাদের বিয়ে হয়েছে তাই তাদের সাথে যোগাযোগ নাই বললেই চলে। মা বাবা ছাড়া চাচার সংসারে শরীফ বড় হচ্ছিলো। বড় হয়ে পুলিশে চাকুরী করবে শরীফ সেই স্বপ্ন দেখতো চাচা। কিন্তু মোটরসাইকেল দূর্ঘটনা কেড়ে নিলো শরীফকে।
নিহত আবু বক্করের বাবা মো. শাহজালাল জানান, গত বছর তিনি ছেলেকে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সোমবার টিফিনের সময় বক্কর তার দুই বন্ধু শরীফ ও সায়েমের সঙ্গে ঘুরতে বের হলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ‘ছেলে কোনো কিছু চাওয়ার আগেই দিয়ে দিতাম। গত বছর ছেলেটা একটা অ্যাপাচি আরটিআর বাইক চায়। কিনেও দিয়েছিলাম। সেই বাইকেই ছেলেটা অ্যাক্সিডেন্ট করে চলে গেল।’
আবু বক্করের মা বলেন, ‘ছেলের কখনও কোনো কিছুর অভাব রাখিনি। তাই শখ মেটাতে হোন্ডা কিনে দিয়েছিলাম। সেই হোন্ডাই আমার এক মাত্র সোনার ছেলেকে কেড়ে নিল। আর মা ডাক শুনতে পারব না আমি।’
নিহত শরীফের চাচা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে শরীফ আমার কাছেই বড় হচ্ছিল। আমার নিজের ছেলের মতো থাকত। চাচিকে বলে সকালে স্কুল গেছে। আর ওর জীবিত ফেরা হলো না। লাশ হয়ে আমার ভাতিজাটা বাড়ি ফিরল।’
নিহত সায়েমের মা বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য সব কাগজপাতি জমা দিয়েছি। গাড়ি চালানোও শিখিয়েছি কিন্তু সেই বিদেশ যাওয়া আর হলো না। স্কুলে গেল পড়তে, বাড়ি ফিরল লাশ হয়ে।’
ধলাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এজাহারুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, মোটরসাইকেলটি অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।
ঘাটাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘তিনজনের পরিবারই ময়নাতদন্তের বিষয়ে আপত্তি করে। তাই তাদের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানোর জন্যই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছি। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বক্করের লাইসেন্স ছিল না। দুর্ঘটনার সময় কেউ হেলমেটও পরে ছিল না।’
