অবশেষে বাড়লো বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল, নাখোশ পরিবহন মালিকরা

নজর২৪ ডেস্ক- টোল বেড়েছে যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতু এবং ধলেশ^রী নদীর ওপর মুক্তারপুর সেতুর। উভয় সেতুতেই বড় পণ্যবাহী যানবাহনে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ টোল বেড়েছে। গত সোমবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সেতু বিভাগ।

 

সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) বলেছে, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে এবং সেতু নির্মাণে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ শোধে ১৭ শতাংশ টোল বৃদ্ধি করা হয়েছে। সফটওয়্যার হালনাগাদের পর আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বর্ধিত হারে টোল আদায় করা হবে সেতুতে চলাচলকারী যানবাহন থেকে।

 

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে অবিলম্বে বর্ধিত টোল হার কার্যকর হবে। কবে থেকে বাড়বে টোল- এ প্রশ্নে সেতু বিভাগের সচিব আবু বকর বলেছেন, দুই সেতুতে টোল পদ্ধতি কম্পিউটার বেইজড। সফটওয়্যার হালনাগাদের কাজ চলছে। তা শেষ হলে মঙ্গল কিংবা বুধবার রাত ১২টা থেকে বর্ধিত টোল আদায় শুরু হবে।

 

এর আগে গত ২৪ জুন সেতু কর্তৃপক্ষের ১১০তম বোর্ড সভায় টোল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। যদিও সেতু বিভাগের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা।

 

তারা বলছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সরকার টোল বাড়িয়েছে। এতে করে পণ্য পরিবহনে ভাড়া বাড়বে, যার ফলে বাড়বে দ্রব্যমূল্যও।

 

বঙ্গবন্ধু সেতুতে তিন এক্সেলের বড় ট্রাকের টোল ৪৩ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার ৪০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে চার এক্সেলের ট্রেইলারেও এক হাজার ৪০০ টাকা টোল নেওয়া হয়। নতুন টোল হার অনুযায়ী- ট্রেইলারকে পৃথক শ্রেণির যান হিসেবে নির্ধারণ করায় তিন হাজার টোল দিতে হবে প্রতিবার বঙ্গবন্ধু সেতু পার হতে।

 

বাড়তি প্রতি এক্সেলের জন্য এক হাজার টাকা করে টোল দিতে হবে। পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ ছয় এক্সেলের প্রাইম মুভার চলাচল করে। এ গাড়িতে টোল দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা। এখন দিতে হয় এক হাজার ৪০০ টাকা। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন চলাচলের বার্ষিক টোল ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা হয়েছে।

 

যাত্রীবাহী যানবহনে টোল তুলনামূলক কম বেড়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে সাইকেলের টোল ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা, কার ও জিপে ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৫৫০ টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে মাইক্রোবাস ও পিকাআপেও টোল ৫০০ টাকা। তা বেড়ে হয়েছে ৬০০ টাকা। ৩২ আসনের কম অর্থাৎ ছোট বাসের টোল ৬৫০ থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে। বড় বাসে টোল ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু সেতুতে। বড় ও ছোট বাসে যাত্রীপ্রতি তিন থেকে চার টাকা ভাড়া বাড়বে।

 

বঙ্গবন্ধু সেতুতে ছোট, মাঝারি ও বড়- এই তিন ক্যাটাগরিতে ট্রাকের টোল নেওয়া হয়। নতুন নিয়মে ক্যাটাগরি চারটি করা হয়েছে। পাঁচ টনের কম অর্থাৎ ছোট ট্রাকে টোল ৮৫০ থেকে বাড়িয়ে এক হাজার করা হয়েছে। পাঁচ থেকে আট টনের ট্রাকে ৮৫০ টাকার টোল ৪৭ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার ২৫০ টাকা হয়েছে। আট থেকে ১১ টনের ট্রাকের টোল ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা হয়েছে।

 

এক হাজার ৫২১ মিটার দীর্ঘ মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর সেতুতে তিন চাকার গাড়ি ও মোটরসাইকেলের টোল ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা, অটোরিকশায় ২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা, কার ও মাইক্রোবাসে ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা, ছোট বাসে ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, বড় বাসে ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

২০০৮ সালে নির্মিত মুক্তারপুর সেতুতেও যাত্রীবাহীর তুলনায় পণ্যবাহী গাড়িতে টোল বেশি বেড়েছে। ছোট ট্রাকে ১৫০ টাকার টোল ৫০ বাড়লেও আট থেকে ১১ টনের ট্রাকের টোল তিনগুণ বেড়েছে। ২০০ থেকে ৬০০ টাকা হয়েছে। বড় ট্রাকে ৬০ শতাংশ টোল বেড়েছে। ৫০০ টাকার টোল ৮০০ টাকা হয়েছে।

 

এ সেতুতেও ট্রেইলার, কভার্ড ভ্যান, প্রাইম মুভারের মতো বড় পণ্যবাহী গাড়িতে বড় ট্রাকের হিসাবে টোল নেওয়া হয়। চার এক্সেলের ট্রেইলারে এক হাজার টাকা টোল দিতে হবে। এখন দিতে হয় ৫০০ টাকা। মুক্তারপুর সেতুতে বাড়তি প্রতি এক্সেলের জন্য বাড়তি ৫০০ টাকা করে দিতে হবে। ছয় এক্সেলের গাড়িকে দুই হাজার টোল দিতে হবে।

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, টোল বৃদ্ধির বিষয়ে কিছুই জানেন না। করোনা মহামারিতে পরিবহন ব্যবসার অবস্থা খারাপ। এমন সময়ে টোল বৃদ্ধি অযৌক্তিক।

 

ট্রাক কভার্ড ভ্যান প্রাইম মুভার পণ্যবাহী মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মকবুল আহমেদ বলেছেন, সরকার তাদের অবগত না করে টোল বাড়িয়েছে। উত্তরবঙ্গ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার কৃষিপণ্যাহী প্রাইম মুভার, ট্রাক, ট্রেইলার সারাদেশে যায় বঙ্গবন্ধু সেতু হয়েছে। টোল বাড়ায় গাড়ির ভাড়া বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্য ও দ্রব্যমূল্য বাড়বে।

 

ট্রাক কভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী বলেছেন, টোল বৃদ্ধির বিষয়ে কী করা যায় তার মালিক সংগঠনগুলোর আলোচনা ঠিক হবে।

 

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ ওসমান আলী বলেছেন, টোল বৃদ্ধি শ্রমিকের স্বার্থের বিরোধী। মালিকরা কর্মর্সূচি দিলে শ্রমিকরা সমর্থন করবে।

 

সেতু সচিব তথা সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সেতুতে সর্বশেষ ২০১১ সালে ১৭ শতাংশ টোল বাড়ানো হয়েছিল। দ্রব্যমূল্য ও জনগণের কথা চিন্তা করেই ১০ বছর পর মাত্র ১৭ শতাংশ টোল বাড়ানো হয়েছে। আরও আগেই টোল বাড়ত। করোনার কারণে এক বছর পর বাড়ানো হয়েছে। মুক্তারপুর সেতুতে ১৩ বছরে প্রথম টোল বাড়ছে। নতুন হারে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে ট্রাককে। ট্রেইলারকে আলাদা শ্রেণি করা হয়েছে। এ কারণে মনে হচ্ছে টোল অনেক বেড়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *