নজর২৪ ডেস্ক- সড়কে পুলিশ মামলা করতে উদ্যত হওয়ায় অ্যাপে চালানো একটি মোটরসাইকেলে বাইকারের আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় তোলপাড়। সেখানে কী হয়েছিল, বিস্তারিত বলছে না পুলিশ। বাইকারও চলে গেছেন।
তবে ঘটনাস্থল গুলশান-বাড্ডায় গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী বেশ কয়েকজনকে পাওয়া গেল, যাদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া গেছে। খবর- নিউজ বাংলার
স্থানীয়রা জানান, গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড দিয়ে গুলশানের পথে যাত্রা করে সেই বাইকার সড়ক বিভাজকের একটি ফাঁক দিয়ে উল্টো দিকের সড়কে চলে আসতে চান। সেই ফাঁক দিয়ে মূলত হেঁটে চলে মানুষ।
এ সময় সেখানে দায়িত্ব পালন করা একজন সার্জেন্ট সেই বাইকারকে আটকে দিয়ে কাগজপত্র চান। তখন তিনি মামলা না দিতে আকুতি-মিনতি করেন। বলেন, বাইকে যাত্রী টেনে সংসার চালান। কিছুদিন আগেও একটি মামলা হয়েছে। টাকার অভাবে ভাঙাতে পারেননি। এখন আবার মামলা দিলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।
কিন্তু সেই সার্জেন্ট তার অনুরোধে গা করেননি। তিনি মামলা করতে কোমরে থাকা পজ মেশিন বের করেন। সে সময় সেই বাইকার হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বাইক থেকে তেল বের করে আগুন ধরিয়ে দেন।
এরপর আর মামলা করেননি সার্জেন্ট। তবে তাকে আর পাওয়া যায়নি।
সেই বাইকারের নাম শওকত আলম সোহেল। তিনি কেরানীগঞ্জে থাকেন। স্যানিটারি পণ্যের ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। করোনার সময় ব্যবসায় লোকসান দেয়ার পর বাইকে যাত্রী টেনে সংসার চালাতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
যে এলাকাটিতে শওকত তার বাইকে আগুন দিয়েছেন, তার পাশেই মুদি দোকান ‘ভাই ভাই জেনারেল স্টোর’। এর মালিক মালিক জাকির হোসেন তখন দোকানে বসা। ছুটে এসে পানি ঢেলে আগুন নেভান।
তিনি বলেন, ‘আমি দোকান থেইকা বাইর হইয়া দেহি, বাইকে আগুন জ্বলতেছে। সবাই দেখি ভিডিও করে, কেউ আগুন নিভায় না। পরে আমি ড্রাম থেইকা পানি দিছি। দেহি নিভে না। ওই লোক (শওকত) আমার গায়ে পর্যন্ত হাত উঠাইছে। পরে আমি জনতা ইনস্যুরেন্স থেইকা পাইপ টাইনা আইনা আগুন নিভাইছি।’
মিরাদুল মুনিম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর সেটি ভিডিও করে ফেসবুকে শেয়ার করেন। মুহূর্তে সেটি ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিওতে দেখা যায়, বাইকে আগুন দিয়ে শওকত উদভ্রান্তের মতো চিৎকার করছেন। প্রত্যক্ষদর্শী একজন পানি ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন। তখন তিনি এসে তাকেই বাধা দেন। বলেন, ‘কেউ যাবেন না, আপনারা কেউ যাবেন না।’
অন্য একজন শওকতকে বলেন, ‘ভাই মাথা ঠান্ডা করেন।’
জাকির হোসেন বলেন, ‘আগুন নিভাইতে গেলে ওই লোক আমারে দুইবার বাধা দিছে। একবার গালি দিছে, গায়ে ধরছে। পরে আমার লগে শক্তিতে পারে নাই। চাপাইয়া দিছি। আগুল লাগলে আমার দোকান পুড়ত। জনতা ইনস্যুরেন্স পুড়ত। পেছনে আছে কাপড়ের দোকান।’
কেন নিজের বাইকে আগুন দিলেন সেই ব্যক্তি?
জাকির বলেন, ‘সার্জেন্ট মামলা দেয়ার আগেই বাইকে আগুন দিছে। সার্জেন্ট মামলা দিতেই পারে। তার মানে আগুন লাগাইয়া দিবে? আপনি সার্জেন্টের সাথে কথা কন। এইখানে সকাল থেইকা সন্ধ্যা পর্যন্ত এক হাজার হোন্ডা থাহে।’
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জহির মিয়া বলেন, ‘আমি এইখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি বাইকের আগুন জাকির ভাই নিভাচ্ছেন। এখানে এসে শুনলাম সামনের কাটা রাস্তা দিয়ে বাইক ঘুরাচ্ছিলেন ওই বাইকার। ঘোরার সময় সার্জেন্ট গাড়ি চাপাইছে। চাপানোর পর মামলা দিতে চাইছেন।
‘বাইকের ড্রাইভার অনেক অনুরোধ করছেন। কিন্তু সার্জেন্ট মামলা দিতে গেলে উনি নিজের বাইকে নিজে আগুন দেন। আগুন দেয়ার সাথে সাথে সার্জেন্ট দূরে সরে গেছেন।’
তিনি আরও বলেন, “জাকির ভাই আগুন নিভাতে গেলে জাকির ভাইকে ওই বাইকার বলছিলেন, ‘এই মিয়া আমার বাইক নেয়ানো লাগবে না আপনার’। বকাঝকা করছেন। বাইক তো অকটেন, পেট্রলে চলে। হঠাৎ করে আগুন লেগে ব্লাস্ট হলে পাশের দোকান ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে আগুন লাগলে তো ক্ষতি হয়ে যেত।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার সুবীর রঞ্জন দাশ বলেন, ‘জনতা ইন্সুরেন্স কোম্পানির বিল্ডিংয়ের সামনে মোটরসাইকেল, বাস দাঁড়িয়ে থাকে। এতে যানজট হয়। আজকে একটা মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে ছিল, সার্জেন্ট গিয়ে কাগজ চাইলে, ওই ভদ্রলোক কাগজ দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ধরিয়ে দেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন দিয়ে দেন।’
তিনি বলেন, ‘উনি ভেবেছিলেন মামলা হবে। মামলা হওয়ার আগেই আগুন দেন। উনি হতাশায় ছিলেন। যা থেকে উনি এমনটা করেছেন। আমি উনার সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা হয়েছে। এ ব্যাপারে পরবর্তী ব্যবস্থা আমাদের ঊর্ধ্বতন স্যাররা নেবেন।’
এদিকে পুলিশি হয়রানির কারণে শওকত আলম ত্যাক্ত-বিরক্ত ও হতাশায় এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে অ্যাপ-বেইজড ড্রাইভারস ইউনিয়ন অব বাংলাদেশ (ডিআরডিইউ)।
পুলিশি হয়রানির বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে মঙ্গলবার কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে ডিআরডিইউ।
সোমবার দুপুরে ডিআরডিইউ’র সাধারণ সম্পাদক বেলাল আহমেদ গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘বাড্ডার ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। হয়রানির জন্য একজন চালক তার মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনাও যদি পুলিশকে নাড়া না দেয়, তাহলে কি আ.ত্ম.হুতি দিলে তাদের বিবেক নাড়া দেবে?’
ডিআরডিইউএর সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘গাড়ি কোথাও ব্রেক করলেই ধরে ফেলে ট্রাফিক পুলিশ। সরকার আমাদের জায়গা নির্ধারণ করে দিক। তাহলে আমরা যত্রতত্র দাঁড়াবো না। আমাদের শহর অনুযায়ী যতটুকু জায়গা দেওয়া যায় ততটুকু দেওয়া হোক। যদি ১০টা স্পট দেওয়া হয়, আমরা সেই ১০টাতেই দাঁড়াব।’
বেলাল আহমেদ বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা কয়েক দফা জানিয়েছি, কিন্তু কোনও প্রতিষ্ঠান আমাদের গ্রহণ করেনি। আমরা ষষ্ঠবারের মতো আন্দোলনে যাচ্ছি। আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করবো। কোনও ভায়ো.লেন্সে বিশ্বাসী না।’
