রাস্তা ছাড়াই বিলের মাঝখানে চারটি ‘এতিম সেতু’!

নজর২৪, ময়মনসিংহ- ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বিলের মাঝখানে চারটি সেতু দাঁড়িয়ে আছে। ১৫ বছর আগে নির্মাণ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় কোনো কাজেই আসছে না সেতুগুলো। বর্ষায় সেতুগুলো ছুঁইছুঁই করে পানি আর শুকনো মৌসুমে সেতুতে উঠতে লাগে মই।

 

উপজেলার নড়াইল ইউনিয়নের বিলে সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ইউনিয়নটির শিবধরা বিল ও ধলিকুড়ি বিলের মাঝখান দিয়ে পূর্ব নড়াইল থেকে কাওয়ালিজানের মধ্যে যোগাযোগ ও চলাচল সহজ করার জন্য নির্মিত হয়েছিল। সেতু নির্মাণের পরও বছরের পর বছর এভাবে দুর্ভোগ পোহানোর কারণে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তবে, এবার রাস্তা নির্মাণ করা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউএসএআইডি দাতা সংস্থার অর্থায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন ২০০৬ সালের মার্চ মাসে সেতুগুলো নির্মাণ করেন। এসব সেতুর একটি ৬৩ ফুট ও বাকি তিনটির প্রতিটিই ৪৫ ফুট দীর্ঘ। নির্মাণের মাত্র এক বছরের মধ্যে পানির তোড়ে রাস্তার মাটি সরে যায়। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে দুর্ভোগ।

 

স্থানীয়রা জানান, নড়াইল ইউনিয়নের পূর্ব নড়াইল, কালিয়ানিকান্দা গ্রামসহ চরবাঙ্গাইল্যা, গোপীনগর, থৈইল্যাপাড়া, মাছাইল, কুমুরিয়া, খালপাড় ও আশপাশ এলাকার কয়েক হাজার মানুষ এই সেতুগুলোর মাধ্যমেই গ্রাম উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে ফলাফল হয়েছে উল্টো।
পাঁচ মিনিটের রাস্তা অন্য দিক দিয়ে ঘুরে যেতে চার ঘন্টা সময় লাগে। স্কুল কলেজ খোলা থাকার সময়ে প্রতিদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনা। এছাড়া রাস্তা না থাকার কারনে অসংখ্য বিয়ে ভেঙে গেছে। বিবাহযোগ্যা ছেলেমেয়েদের নিয়ে চিন্তিত অনেক পরিবার।

 

পূর্ব নড়াইল গ্রামের হামিদুর রহমান ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি বলেন, সেতু নির্মাণের আগে রাস্তা কেন নির্মাণ করা হলো না? উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে দুর্ভোগে ফেলার কোনু মানে হয়না। সেতু নির্মাণের নামে শুধু টাকাগুলো অপচয় করা হয়েছে।

 

একই গ্রামের ষাটোর্ধ ফজলুল হক ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলেন, আমরার ভালার (ভালোর) লাইগ্যা সেতু বানাইছে না। ট্যাহা খরচ করন লাগব, তাই হুদাই বানায়্যা ট্যাহা (টাকা) খরচ করছে।

 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইজ পর্যন্ত এই রাস্তায় কেউ এক কোদাল মাটি ফালছে না। অহন আমাগর গুরুত্ব নাই। ভোটের আগে ঠিকই মাথা আতায়্যা ভোট চাইবো। তখন কে কিরুম উন্নয়ন করছে জিগায়্যাম। বুইঝ্যা হুইন্যা ব্যালটে ছিল মারবাম।

 

কালিয়ানিকান্দা গ্রামের কৃষক আহম্মদ আলী বলেন, ধানসহ অন্যান্য ফসল বাড়িতে আনার জন্য সেতুর সড়কটি আমরা ব্যবহার করি। শুকনো মৌসুমে কোনোরকমে আনতে পারলেও বর্ষা মৌসুমে আনা যায়না। কারন সেতুতে মই দিয়ে উঠতেও কষ্ট হয়। সমান্য বৃষ্টিতে বন্যা হয়। ফলে নৌকা ব্যবহার করি। খুব দ্রুত রাস্তাটি মেরামত করা প্রয়োজন।

 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ড ভিশন ময়মনসিংহের এরিয়া ম্যানেজার রাজু উইলিয়াম রোজারিও বলেন, ২০০৬ সালের মার্চ মাসে সেতু নির্মাণের কাজ শেষ করেছিলাম। তবে, সংযোগ রাস্তা নির্মাণ বা সংস্থার করার কথা ছিলো জনপ্রতিনিধিদের। তারা কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় সেতুগুলো কারও কাজে আসেনি।

 

সেতুগুলো নির্মিত হয়েছিল নড়াইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নবী হোসেনের সময়ে। বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বলেন, এই রাস্তাটি দিয়েই কয়েকহাজার মানুষকে ইউনিয়ন পরিষদে আসতে হয়। সেতুগুলো নির্মিত হওয়ার সময় রাস্তায় মাটি ফেলে চলাচলের উপযোগী করেছিলাম। এরপর থেকে কেউ এ রাস্তায় মাটি দেয়নি। এমতাবস্থায় দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ এ রাস্তাটি বিলিন হয়ে যাচ্ছে।

 

তিনি বলেন, রাস্তাটির গুরুত্ব ও স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়টি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি। আশা করছি তারা উদ্যোগ নিবেন।

 

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক সায়েম বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে রাস্তা থেকে পানি কমে যাবে। ফলে পানি কমার সাথে সাথেই রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করবো। ফলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ আর থাকবে না।

 

এ বিষয়ে হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল করিম বলেন, যেহেতু বিলের মাঝখানে সেতুগুলো নির্মিত হয়েছে। সেহেতু সাধারণভাবে রাস্তা করলে পানির তোড়ে আবারও ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাবমার্সিবল রাস্তা করলে অনেক টেকসই হবে। এজন্য উর্ধ্বতন কর্মকতাদের কাছে দ্রুত একটি প্রস্তাবনা পাঠাবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *