নজর২৪ ডেস্ক- নিজের কষ্টার্জিত জমানো টাকা ব্যাংকে জমা রেখে লাভ নয় বরং বছর শেষে লোকসান গুনছেন আমানতকারী। অন্যদিকে ব্যাংক আমানতে লোকসান হওয়ায় অনেকেই আবার প্রতারিত হন ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করে। হিসাব বলছে স্থায়ী আমানতে মূল্যস্ফীতি ও উৎসে কর বাদ দিলে একজন আমানতকারী ১শ টাকার বিপরীতে বছর শেষে প্রকৃত ফেরত পাচ্ছেন জমা টাকার চেয়েও কম।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন; আমানতের সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি আমানতকারীদের বিকল্প বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে মিউচুয়াল ফান্ডের প্রচারণা ও সহজ করার পাশাপাশি, বিশেষ সঞ্চয়ী স্কীম চালু রাখা প্রয়োজন।
কানাডার প্রবাস জীবন ছেড়ে চার বছর আগে দেশে ফিরেছেন আজরা নারভীন আহমেদ। বাবা মা নেই; একমাত্র বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ভাইকে নিয়ে থাকেন বনানীর একটি বাড়িতে। পরিবারের দায়ভার মেটাতে জমানো সব সঞ্চয় রেখেছিলেন একটি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে অবসায়নে দেয়ার সিদ্ধান্ত হলে নি:স্ব হয়ে পড়ে পরিবারটি। জানালেন; ব্যাংকে আমানতের সুদহার এতটাই কম যা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তাই দ্বারস্থ হয়েছিলেন নন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের।
বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত সৈয়দ সেলিম উদ্দিন আহামেদ। পরিবারের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সোনালী ব্যাংকে এসেছেন সঞ্চয়পত্র কিনতে। ব্যাংকে স্থায়ী আমানতের সুদহার নিয়ে তার হতাশাও তীব্র।
করোনাকালে যখন মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে তখন ব্যাংক আমানতের সুদ এতটাই কম যে তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবী; মধ্যবিত্ত কিংবা ক্ষুদ্র আমানতকারী সকলেরই।
ধরা যাক, একজন আমানতকারী ১ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখলেন ১ বছর মেয়াদে। বিদ্যমান গড় সুদহার সাড়ে ৪ শতাংশ হিসেবে বছর শেষে ফেরত পাবেন ১ লাখ সাড়ে ৪ হাজার টাকা। যা থেকে ১ বছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৫.৫৬ শতাংশ (বা ৫,৫৬০ টাকা ) এবং ১০ শতাংশ উৎসে কর (৪৫০ টাকা ) বাদ দিলে গ্রাহক এর পকেটে নিট জমা হচ্ছে ৯৮,৪৯০ টাকা। অর্থাৎ বছর শেষে স্থায়ী আমানতে লোকসান গুনছেন আমানতকারী।
ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েক বছর আগেও ব্যাংকে মেয়াদি আমানত রেখে ৯ থেকে ১২ শতাংশ সুদ পাওয়া যেত। তবে ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর অলস অর্থের কারণে হাতে গোনা দু-একটি ব্যাংক ছাড়া ৫ থেকে ৬ শতাংশের বেশি সুদ মিলছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সুদহার নির্দিষ্ট করে দেয়ার কারণে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দরিদ্র, মধ্যবিত্তদের মূল সম্পদ হচ্ছে টাকা। সামান্য টাকা তারা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ব্যাংকে রাখেন। কিন্তু সুদ এত কম যে, তাদের টাকা কমে যাচ্ছে। ফলে সঞ্চয়ের অভ্যাস কমে যাবে।’
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলী বলেন, ‘বর্তমানে আমানতে যে সুদ দেয়া হচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এর চেয়ে বেশি সুদ দেয়ার সুযোগও নেই। যারা আমানতের সুদের ওপর নির্ভরশীল, তাদের চলা আসলেই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ঋণের সুদহার নির্দিষ্ট করে দেয়ায় ব্যাংকগুলো আমানতে বেশি সুদ দিতে পারছে না। এ জন্য যারা সুদের ওপর নির্ভরশীল, তাদের সমস্যা হচ্ছে। অনেকেই অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। কিন্তু ব্যাংকে টাকা রাখা যত সহজ, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ তত সহজ নয়। ফলে মানুষ ঘুরেফিরে ব্যাংকেই ফিরে আসছেন।’
