বাবুনগরীর মৃত্যু : আরেক দফা ভাঙনের মুখে হেফাজতে ইসলাম?

নজর২৪ ডেস্ক- দীর্ঘ ১০ বছরের নেতা শাহ আহমদ শফীর যতটা নিয়ন্ত্রণ ছিল হেফাজতে ইসলামে, ততটা ছিল না জুনায়েদ বাবুনগরীর। তার নেতৃত্বে আসা নিয়ে সংগঠনে ভাঙন ধরে কমিটি গঠনের আগেই।

 

আবার কমিটি গঠনের পরেও অন্তত দুইজন নায়েবে আমির বাবুনগরীর নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে সংগঠন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ঢাকার একজন নেতা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তার বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

 

তারপরেও হেফাজতে বাবুনগরীর দৃশ্যত কোনো বিকল্প ছিল না। যে কারণে সংগঠন কমিটি ভেঙে দেয়ার পরেও তিনিই ছিলেন নেতৃত্বে। আর গত এপ্রিলে ধরপাকড়ের পর থেকে তিনিই সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করে গেছেন। তার মৃ্ত্যু হয়েছে অকস্মাৎ। এটি সমর্থকদের জন্যও একটি আঘাত, সংগঠনের জন্যও তৈরি করেছে সমস্যা।

 

এর কারণ, নতুন নেতৃত্ব বেছে নিতে যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে আছে প্রশ্ন। আবার নেতৃত্বে আসার মতো একক কোনো নামও নেই সংগঠনে।

 

২০১০ সালে হেফাজত গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত নেতৃত্ব ধরে রেখেছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা। হেফাজতের নেতৃত্ব তাদের মধ্যেই রাখতে আগ্রহী। কিন্তু দ্বন্দ্ব-বিরোধের আশঙ্কায় আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর মাদ্রাসার মুহতামিমই নির্বাচিত করা যায়নি কাউকে। এই অবস্থায় হেফাজতের নেতৃত্বে একজনকে আনাটা কঠিন হবে তাদের জন্য।

 

সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুহিব্বুলাহ বাবুনগরীর একটি অবস্থান আছে হেফাজতে। কিন্তু তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক নন। পাশাপাশি তার বয়স ৯০ বছরের বেশি। তাকে ভারপ্রাপ্ত আমির করা হলেও এই দুটি কারণে তিনি পূর্ণাঙ্গ আমিরের পদ পাবেন কি না, তা নিয়ে আছে সংশয়।

 

হেফাজতের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জেহাদী এখন দৃশ্যত প্রধান নেতা। কিন্তু তার প্রভাব সংগঠনে কম। আর তিনি ঢাকার নেতা হিসেবে আমির হওয়ার তালিকায় তার নাম না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

 

গত মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় শক্তি দেখাতে গিয়ে সংগঠনের অবস্থা এখন নিভু নিভু।

 

শতাধিক নাশকতার মামলা, শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার, আত্মগোপন, জ্যেষ্ঠ নেতাদের পদত্যাগ এবং হেফাজতে ইসলামের অপর একটি অংশের প্রকাশ্যে বর্তমান কমিটির বিরোধিতার কারণে ২০১৩ সালে ভীষণ প্রভাবশালী হয়ে ওঠা সংগঠনটি এখন আলোচনাতে নেই বললেই চলে। নানা হুমকিধমকি দিয়ে আসা নেতারা পরে সরকারের কাছে অনুনয় বিনয় করে আসছেন। সব মিলিয়ে যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যেই মৃত্যু হলো বাবুনগরীর।

 

২০২০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আলোচিত এ ধর্মীয় সংগঠনটি গত নভেম্বরে যে জাতীয় সম্মেলন করে তাতে প্রয়াত আমির আল্লামা শফীর অনুসারীরা পদ-পদবি পাননি। তারপর থেকে ওই অংশ বর্তমান কমিটির বিরোধিতা করে আসছে। ফলে এক দফা ভাঙনের মুখে পড়ে সংগঠনটি। বাবুনগরীর মৃত্যুর পর সংগঠনটি আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়বে কি না সেটি এখন দেখার বিষয়।

 

বাবুনগরীর অনুসারী হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস বৃহস্পতিবার বিকেলে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বলেন, ‘বাবুনগরীর মৃত্যুর কারণে সংকট তৈরি হবে। তবে আশা করি সেটি বেশি দিন স্থায়ী হবে না। সংকট দ্রুত কেটে যাবে। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।’

 

সংগঠনের পরবর্তী নেতৃত্বে কে আসবেন- এমন প্রশ্নে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘এখনও এ বিষয়ে কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে আমি এখন কিছুই বলতে পারব না। তবে দ্রুতই এ বিষয়ে আমরা বসে সিদ্ধান্ত নেব।’

 

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) বেলা ১২ টার দিকে হেফাজতে ইসলামের আমীর জুনায়েদ বাবুনগরী গুরুতর অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে মারা যান।

 

বাংলাদেশে নানা সময়ে আলোচিত হয়েছেন হেফাজতে ইসলামের এই নেতা। তিনি সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর। শফী নেতৃত্বে থাকার সময় হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় আসে। তখন বাবুনগরী সংগঠনটির মহাসচিব ছিলেন। সেসময় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

 

এরপর এক পর্যায়ে সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে সরকারের সখ্য গড়ে উঠেছিল এবং তা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমানও হয়েছিল। তবে শফীর মৃত্যুর ঘটনা এবং তারপর জুনায়েদ বাবুনগরীর সংগঠনটির নেতৃত্বের আসা নিয়ে হেফাজতে ইসলামের একটি অংশ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়। আহমদ শফীর পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ এনে একপর্যায়ে মামলাও করা হয়।

 

হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর সংগঠনটির নেতৃত্বে আসেন জুনায়েদ বাবুনগরী। অন্যদিকে জুনায়েদ বাবুনগরী যখন নেতৃত্বে আসেন, তখন সরকারের সাথে হেফাজতে ইসলামের একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। সংগঠনটির নেতাদের অনেকের বক্তব্যে বিভিন্ন সময় তা উঠে এসেছে।

 

এ বছরের মার্চ মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের সময় হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সহিংসতা হওয়ার পর সংগঠনটি সরকারের চাপের মুখে পড়ে।

 

নানা আলোচনা-বিতর্ক এবং সরকারের চাপের মুখে, হেফাজতের কমিটি একবার ভেঙে দিয়ে এডহক কমিটি করেছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী। এর মাসদুয়েক পর তিনি নিজে আমীর হয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *