পরীমণির বার্ষিক আয় সাড়ে ৯ লাখ, জানা গেল চাঞ্চল্যকর তথ্য

নজর২৪ ডেস্ক- সম্প্রতি নায়িকা পরীমণির বাসায় অভিযান চালায় র‍্যাব। এ সময় বিপুল পরিমাণ মাদকসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে আদালতে তোলা হলে ২ দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

মাদকসহ গ্রেফতারের পর ঢাকাই ছবির এই নায়িকাকে নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তার বিলাসী জীবনযাত্রা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

 

এর আগে গত বছরের জুনে পরীমণি আলোচনায় আসেন সাড়ে তিন কোটি টাকার ইতালিয়ান অভিজাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিয়াট অটোমোবাইলসের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘মাসেরাতি’ গাড়ি নিয়ে। যদিও কাগজে-কলমে তিনি প্রায় কোটি টাকা দামের টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ির মালিক।

 

এছাড়া রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী ১৯/এ সড়কের ১২ নম্বর বাড়ির পাঁচতলার যে ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করেন, তার দামও ১০ কোটি টাকার বেশি হবে— বিভিন্ন সূত্রে এমন তথ্য বলা হয়েছে বারবার।

 

অথচ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পরীমণি যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, সেখানে তিনি ৫০ হাজার টাকার কর পরিশোধ করেন। টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়িটির করও এখানে যুক্ত হয়েছে। রিটার্নে পরীমণি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন প্রায় সাড়ে নয় লাখ টাকা।

 

এনবিআরে জমা দেওয়া ২০১৯-২০ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নের কোথাও পরীমণির ওই ফ্ল্যাটের মালিকানার বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিশোধ করা করের বড় অংশই মূলত গাড়ির কর হিসেবে জমা হয়েছে। সেই অর্থে তার আয়করের অঙ্ক খুব বেশি নয়। এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

 

আরও জানা যায়, পরীমণি ২০১৪ সালের নভেম্বরে নিজের নামে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) গ্রহণ করেন। কর অঞ্চল- ১২ এর আওতায় ২০১৬ সালে তিনি প্রথম আয়কর রিটার্ন (২০১৫-১৬ অর্থবছর) জমা দেন। প্রথম বছরের রিটার্নে আয় দেখিয়েছিলেন প্রায় সাত লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে নয় লাখ টাকা আয় দেখান পরীমণি।

 

প্রথম আয়কর রিটার্নে পরীমণি টয়োটা অ্যালিয়েন- ২০১৫ মডেলের গাড়ির কথা উল্লেখ করেন। সর্বশেষ রিটার্নে ওই গাড়ি বিক্রির কথা উল্লেখ করে সাদা রঙের টয়োটা হ্যারিয়ার কেনার তথ্য দেন। যদিও ২০২০ সালের ২৪ জুন তার সাদা রঙের হ্যারিয়ার গাড়িটি দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

 

দুর্ঘটনার পরপরই সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের ‘মাসেরাতি’ কেনার কথা তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানান। কিন্তু সর্বশেষ রিটার্নে বনানীর ফ্ল্যাটের মালিকানা, এমনকি মাসেরাতি গাড়ির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সম্পদের বিবরণীতে স্বর্ণালঙ্কার ও ফার্নিচারের কথা উল্লেখ আছে। আয়ের বিবরণীতে চলচ্চিত্রে অভিনয় ও মডেলিংয়ের তথ্য উল্লেখ করেন পরীমণি।

 

এ বিষয়ে জানতে কর অঞ্চল- ১২ এর কর কমিশনার মো. আবদুল মজিদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তারা কোনো বক্তব্য দিয়ে রাজি হননি।

 

অন্যদিকে, এনবিআর পরিচালক (জনসংযোগ) সৈয়দ এ মু’মেন বলেন, ‘এনবিআর সবসময় করদাতাদের ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্তের সুরক্ষা দিয়ে থাকে। কোনো করদাতার বিষয়ে আমাদের বক্তব্য নেই। যদি কারও বিরুদ্ধে করফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, সেক্ষেত্রে আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

 

এদিকে, বোট ক্লাবকাণ্ডের পর চলচ্চিত্রাঙ্গনের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ি পরীমণি কীভাবে কিনলেন। কারণ, যেসব সিনেমায় তিনি কাজ করেছেন, সেসবের পারিশ্রমিক মিলিয়ে গাড়ির মূল্যের সমান হবে না। ফ্ল্যাট কেনা তো পরের কথা। প্রায় অর্ধযুগের ক্যারিয়ারে এমন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও দামি গাড়িতে চড়া চলচ্চিত্র জগতের প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় অনেক অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব নয়।

 

ফ্ল্যাট ও গাড়ি নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, তার জবাবে গত ৩০ জুন ফেসবুক স্ট্যাটাসে পরীমণি উল্লেখ করেন, ‘আমার মাত্র একটি হ্যারিয়ার গাড়ি, যেটি ব্যাংক লোনে চলছে। আমি একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাটে থাকি। নিজের আয়ের হিসাব আমি সরকারকে দিই। আমি নিয়মিত একজন করদাতা। আমার কোনো ১০ কোটি টাকার বাড়ি বা ৫/৪/৩ কোটি টাকার গাড়ি নেই।’

 

উল্লেখ্য, গত ১৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফার রিমান্ড শেষে পরীমনি ও তার সহযোগী দিপুকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক গোলাম মোস্তফা। এসময় আসামিপক্ষে তাদের আইনজীবী মজিবুর রহমান জামিন চেয়ে আবেদন করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

 

গত ৪ আগস্ট সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পরীমনিকে তার বনানীর বাসা থেকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। অভিযানে নতুন মাদক এলএসডি, মদ ও আইস উদ্ধার করা হয়। পরীমনির ড্রয়িংরুমের কাভার্ড, শোকেস, ডাইনিংরুম, বেডরুমের সাইড টেবিল ও টয়লেট থেকে বিপুল পরিমাণ মদের বোতল উদ্ধার করা হয়।

 

এরপর রাত ৮টা ১০ মিনিটে পরীমনিকে তার বাসা থেকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে র‌্যাব সদরদফতরে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে গাড়িটি কুর্মিটোলায় র‌্যাব সদরদফতরে পৌঁছায়। সেখানে রাত ১২টা পর্যন্ত পরীমনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব। পরদিন ৫ আগস্ট বিকেল ৫টা ১২ মিনিটে র‌্যাব সদরদফতর থেকে পরীমনি, রাজ ও তাদের দুই সহযোগীকে কালো একটি মাইক্রোবাসে নিয়ে বনানী থানার উদ্দেশে রওনা দেয় র‌্যাবের একটি টিম।

 

এরপর র‌্যাব বাদী হয়ে রাজধানীর বনানী থানায় পরীমনি ও তার সহযোগী বিপুর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলায় করে। মামলার পর রাত ৮টা ২৪ মিনিটে পরীমনি ও তার সহযোগীকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর বনানী থানার মামলায় তাদের চারদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

 

একইদিন ঢাকা মহানগর হাকিম মামুনুর রশীদের আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন। এরপর সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় গত ১০ আগস্ট পরীমনি ও তার সহযোগী দিপুর দুদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *