নামসর্বস্ব ‘লীগের’ অর্ধশত সংগঠন, আইনি ব্যবস্থার ঘোষণা আ.লীগের

নজর২৪ ডেস্ক- সাংগঠনিক প্যাডে ঠিকানা দেয়া ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, যেটি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। সংগঠনের নামের সঙ্গেও যোগ করা হয়েছে ‘লীগ’ শব্দটি– বাংলাদেশ জনতা লীগ।

 

আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না থাকার পরেও নিজেদের এই দলের অঙ্গসংগঠন বলে দাবি করেন এটির নেতারা। সম্প্রতি দেশের ৩০ জেলায় কমিটিও ঘোষণা করেছে এই সংগঠন।

 

অবশ্য এ ধরনের নামসর্বস্ব সংগঠনের কোনো দায়িত্ব নিতে রাজি নয় আওয়ামী লীগ। দলটি বলছে, এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলছেন

এসব নামসর্বস্ব লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হচ্ছে যুবলীগ, মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, তাঁতী লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও মৎস্যজীবী লীগ। জাতীয় শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ হলো দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। আর মহিলা শ্রমিক লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ আওয়ামী লীগের ‘নীতিগত’ অনুমোদিত সংগঠন।

 

তবে নামের সঙ্গে ‘লীগ’ শব্দটি যুক্ত করে সংগঠন পরিচালনা করছে অন্তত অর্ধশত সংগঠন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ ইলেকট্রিক লীগ, নাপিত লীগ, ফকির লীগ, প্রবীণ লীগ, ডিজিটাল লীগ, রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, আওয়ামী ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী লীগ ও ছিন্নমূল হকার্স লীগ।

 

এসব সংগঠনকে সতর্ক করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি। আমাদের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি সহযোগী সংগঠন ছাড়া বাকি যেগুলো আছে, আওয়ামী লীগের নামে বিভিন্নজন করেছে, এগুলোর কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি নেই।

 

‘এরা বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নামটা ব্যবহার করে তাদের সুবিধা ভোগ করার জন্য অবৈধ এ পন্থা অবলম্বন করেছে। এদের বিরুদ্ধে আগেও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। প্রশাসনকে সে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সে সময় অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছিল এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার এ রকম কয়েকটি সংগঠনের নাম শোনা যাচ্ছে।’

 

এ ধরনের সংগঠনের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন হানিফ। তিনি বলেন, ‘আমাদের যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের জন্য খুব সতর্কবার্তা, এ ধরনের অসাংগঠনিক কার্যক্রমে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।

 

সম্প্রতি ফেসবুকে নেতা বানানোর ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞাপন পোস্ট করে বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ নামের একটি সংগঠন। এটির কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নাম আসে হেলেনা জাহাঙ্গীরের। আর সাধারণ সম্পাদক করা হয় মাহবুব মনিরকে।

 

পোস্টারে সংগঠনটির জেলা, উপজেলা ও বিদেশি শাখায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। সংগঠনটির দাবি, দুই-তিন বছর ধরে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে তারা।

 

এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে গণমাধ্যম। ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এর পরের দিনই হেলেনাকে দলের মহিলাবিষয়ক উপকমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়। তবে এ রকম আরও কয়েকটি সংগঠনের খোঁজ পাওয়া গেছে।

 

এ রকমই একটি সংগঠন বাংলাদেশ জনতা লীগ। সংগঠনটির দাবি, তারা আওয়ামী লীগের হয়ে বিভিন্ন ত্রাণকাজ পরিচালনা করে থাকে। আর এ জন্যই দলের ঠিকানাও দেয়া হয়েছে ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ।

 

সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইয়াসিন হাওলাদার মঞ্জু নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন, এটি আওয়ামী লীগের কোনো সহযোগী সংগঠন নয়। এমনকি এর কোনো অনুমোদনও নেই।

 

তিনি বলেন, ‘এটা আওয়ামী লীগের কোনো সহযোগী সংগঠন না। সহযোগী সংগঠন তো অল্প কয়েকটি। এটা ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেবামূলক কর্মকাণ্ড সংগঠনের মাধ্যমে করি। যেমন ত্রাণ দেয়া, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রোগ্রামে অংশ নেয়া এগুলো আমরা করি।’

 

২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ঠিকানা কেন, জানতে চাইলে মঞ্জু বলেন, ‘আসলে নতুন যে সংগঠনগুলো কাজ করে আওয়ামী লীগের হয়ে, তারা মূলত এই ঠিকানাই দেয়। আমাদের এমনিতে আঞ্চলিক অফিস হলো গাজীপুরে। আমি নিজেও সেখানে থাকি।

 

‘আসলে সংগঠনটি ২০২০ সালে করা। এখনও এক বছরও হয়নি। একটা সংগঠন পরিচিতি পেতেও তো দুই-চার-পাঁচ বছর যায়, দল যখন ভালো মনে করবে, মানে এটার যদি রেজিস্ট্রেশন করতে হয়, তখন দেবে। নিবন্ধন যেভাবে সরকারের আইন অনুযায়ী করা হয়, সেটাও আমরা সামনে করব। মহানগর-জেলা মিলিয়ে প্রায় ৩০টির কাছাকাছি কমিটি করেছি।’

এ রকম আরেকটি সংগঠনের সন্ধান মিলেছে, যার নাম বাংলাদেশ আওয়ামী তরুণ জনতা লীগ। তাদেরও সাংগঠনিক প্যাডে ঠিকানা দেয়া আছে ২৬ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। যদিও সেখানে সংগঠনটির ব্যাপারে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া গেল না। সংগঠনটির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে যারা পদ পাচ্ছেন না, তাদের পদ দিচ্ছে এই সংগঠন।

 

সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল মামুন জুয়েল বলেন, ‘এটা আওয়ামী লীগের কোনো নিবন্ধিত সংগঠন না। আমি অনেস্টলি বলছি। এটা নিবন্ধিতও না বা এটার আওয়ামী লীগে কোনো অনুমোদনও নেই।

 

‘যারা দীর্ঘদিন ছাত্রলীগ বা যুবলীগ বা আওয়ামী লীগে কোনো পদ পাচ্ছে না… আমাদের তো একটা দলীয় কার্যক্রম চালাতে হবে। আমরা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসি, থাকতে চাই। আমি আগে বুঝি নাই যে, এটা নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা হবে। আগে যদি জানতাম তাহলে এটা করতামই না।’

 

সম্প্রতি কয়েকটি জেলায় কমিটি দিয়েছে ২০১৮ সালে তৈরি হওয়া এই সংগঠন। যদিও কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, এতে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি।

 

আল মামুন জুয়েল বলেন, ‘কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে, কয়েক জায়গায় আমরা যে কমিটি করেছি, সেখানে কোনো টাকাপয়সা লেনদেন হয়েছে, আমাদের যে শাস্তি দেয়া হবে, আমরা মাথা পেতে নেব। আমরা দলীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে চাই দেখেই এটা করেছিলাম।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *