নজর২৪ ডেস্ক- সীমান্তের প্রতিটি হত্যাই পরিতাপের— কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফরে এসে এমন মন্তব্য করেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। সেসময় তিনি আরও বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রচেষ্টায় সীমান্তের হত্যা বন্ধ সম্ভব।
আদৌ কি সীমান্তের হত্যা বন্ধ হয়েছে? গত সোমবার (১২ জুলাই) ভোররাতে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে গরু নিয়ে ফেরার সময় বিএসএফের (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী) গুলিতে আব্দুর রাজ্জাক (২৫) নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে ওই যুবকের মরদেহ ফেরত পেতে স্থানীয় বসন্তপুর বিজিবি ক্যাম্পে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
এর আগে ২০ মার্চ (শনিবার) ভোর ৪টার দিকে মৌলভীবাজারের জুড়ি সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হন বাপ্পা মিয়া (৪০)। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৫২ ব্যাটালিয়নের ফুলতলা ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার দেলোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। স্থানীয়রা জানান, নিহত ওই যুবক ভারত থেকে গরু এনে ব্যবসা করতেন।
শুধু রাজ্জাক বা বাপ্পা মিয়া নন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গত তিন বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১০৭ বাংলাদেশি। বিপরীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গুলিতে নিহত হয়েছেন মাত্র এক ভারতীয় নাগরিক। একাধিকবার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, মৌখিক আশ্বাস দিয়ে সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় নিতে সম্মত হয় দুই দেশ। তবে কথা রাখছে না প্রতিবেশী দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। সীমান্তে বাংলাদেশিদের বুকে গুলি চালিয়েই যাচ্ছে তারা!
জানা গেছে, অধিকাংশ সময়ই এসব হত্যাকে ‘আত্মরক্ষা’ বলে সাফাই গায় বিএসএফ। অথচ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা তদন্তে দেখা গেছে, সীমান্তে নিহত কোনো বাংলাদেশির কাছে থাকে না কোনো আগ্নেয়াস্ত্র।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪২ বাংলাদেশি। মারধরসহ শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছেন ছয়জন, মরদেহ উদ্ধার হয় একজনের। ‘সীমান্তে মৃত্যু শূন্যে আনার’ প্রতিশ্রুতির মধ্যেও এমন হত্যা বাংলাদেশকে ভাবিয়ে তুলেছে। শুধু হত্যাই নয়, সীমান্ত এলাকা থেকে ৪৮ বাংলাদেশিকে তুলে নিয়ে করা হয়েছে নির্মম নির্যাতনও।
গত ২০ বছরের পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এ সময়ে মোট এক হাজার ২৩৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। এ সংখ্যাটা আনুষ্ঠানিক। সীমান্ত এলাকা থেকে এ সময়ের মধ্যে নিখোঁজ হয়েছেন ১১১ জন। তাদের ভাগ্যে কী জুটেছে, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর নেই কারও কাছে। বিজিবির কাছে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কাউকে গুলির আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং গুলি করে সীমান্তবর্তী থানাগুলোতে একে ‘আত্মরক্ষা’ বলে রেজিস্ট্রার করে বিএসএফ।
রাসেলের চোখ, আজিমের নখ বলে দেয় বিএসএফের নির্মমতা
২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল বিকেলে কুড়িগ্রামের সীমান্তঘেঁষা মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন রাসেল মিয়া নামের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। বিকেল পৌনে ৪টায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সদস্যরা এসে হাজির হন শূন্য রেখার বাংলাদেশ অংশে। রাসেল ভয়ে নদীতে নামলে বিএসএফ সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে শটগান থেকে গুলি ছোঁড়েন। রাসেলের পুরো মুখ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। তিনি আর নদী থেকে ডাঙায় উঠতে পারেননি। পরে আশপাশের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করেন।
গণমাধ্যমের কথা হয় রাসেলের। তিনি বলেন, ‘তারা (বিএসএফ) মদ্যপ ছিল। সীমান্তে এসেই এলোপাতাড়ি গুলি করে। আমার মুখে গুলি লাগে। ডান চোখে আর কখনওই দেখতে পাব না। বাম চোখে ঝাপসা দেখি। চোখে-মুখে রাবার বুলেট (স্প্লিন্টার) ঢুকে আছে। এগুলোও বের করা লাগবে। আমি তো আর চোখে দেখতে পাই না, আমার পড়াশোনার কী হবে? বিএসএফ শুধু আমার চোখই নয়, জীবনটাও নষ্ট করে দিয়েছে।’
রাসেলের বিষয়ে বিজিবি ওই সময় প্রতিবাদ করে। উত্তরে বিএসএফ জানায়, ঘটনাটি ছিল ‘চোরাকারবারিদের আক্রমণ’। তবে বিজিবির তদন্তে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্তের পরিবারের কেউ চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত নয়, ছিলও না।
শুধু রাসেল নন, এমন নৃশংসতার শিকার হন আজিমউদ্দিন নামের এক গরু ব্যবসায়ীও। ২০১৯ সালের এপ্রিলে ওপারে গরু আনতে যান তিনি। ফেরার সময় তাকে ধরে প্লাস (সাঁড়াশি বিশেষ) দিয়ে তুলে নেওয়া হয় হাতের নখ। যন্ত্রণায় আজিম বারবার বিএসএফকে বলেছিল, ‘আমাকে মেরে ফেলুন’। নির্যাতনের পর তাকে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হয়। নির্মম ওই নির্যাতনের স্মৃতি এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এখনও আঁতকে ওঠেন আজিমউদ্দিন।
জানতে চাইলে বিজিবির পরিচালক (অপারেশন ও মুখপাত্র) লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সীমান্তের হত্যাগুলো সাধারণত সীমান্ত অপরাধের কারণে হয়। সীমান্ত অপরাধ কমিয়ে আনলে হত্যাকাণ্ডও কমে আসবে। তবে এ বিষয়ে আমরা নিয়মিত ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছি, নিয়মিত রিমাইন্ডার দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দিনে ও রাতে টহল জোরদার হয়েছে। আশা করছি, হত্যা কমে আসবে।
‘এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দিনে ও রাতে টহল জোরদার করা হয়েছে। আশা করছি, হত্যা কমে আসবে’— যোগ করেন তিনি।
