নজর২৪ ডেস্ক- অবশেষে মুখ খুললেন পরীমণি। ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার দুই ঘণ্টার মাথায় জানালেন তাকে হত্যা ও ধর্ষণচেষ্টায় অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম। জানান, তার ওপর সেদিন রাতে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছেন নাসির ইউ মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি।
নিজের বাসায় গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে বিস্তারিত জানান।
তিনি জানান, ঘটনার মূল হোতা নাসির ইউ মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি। উত্তরা বোট ক্লাব নামে এক ক্লাবের সাবেক সভাপতি তিনি। পেশায় ব্যবসায়ী। ঘটনার দিন রাত ১২টার পর পরিচিতজনদের নিয়ে ওই ক্লাবে যান পরীমনি। সেদিন চারজন মদ্যপ ব্যক্তি পরীমনিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। চড়-থাপ্পড় মারেন। গায়ে আঘাত করেন। এক পর্যায়ে একজন তাকে নেশাদ্রব্য খাইয়ে ধর্ষণের চেষ্টাও করে তারা।
পরী বলেন, বুধবার রাত ১২ টার দিকে অমি নামের একজন পরিচিত ব্যক্তির সাথে উত্তরা বোট ক্লাবে যাই। সেখানে আর কেউ ছিল না। তবে পরে সেখানে নাসির ইউ মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি আসে। তিনি নিজেকে উত্তরা বোট ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট পরিচয় দেন।
এদিকে অভিনেত্রী পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে পুলিশ। ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ করে দেওয়া তার ফেসবুক স্ট্যাটাস নজরে আসার পর পুলিশ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
রোববার (১৩ জুন) রাতে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘পরীমণির ফেসবুক স্ট্যাটাস পুলিশ সদর দফতরের নজরে এসেছে। পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে ইতোমধ্যেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
পুলিশ সদর দফতরের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, পরীমণির অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। তিনি পুলিশের প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত সেবা পাবেন। উপযুক্ত বিচার পাবেন।
কে এই নাসির ইউ মাহমুদে?
উত্তরা বোট ক্লাবের ওয়েসবাইটে গিয়ে নাসির উদ্দিন আহমেদ নামে একজনকে পাওয়া যায়। তিনি সেই ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট।
নাসির জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য। তিনি কুঞ্জ ডেভলপার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান। উত্তরা ক্লাব লিমিটেডের ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ছিলেন লায়ন ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের ডিসট্রিক্ট চেয়ারম্যান।
তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
নাসির উদ্দিনকে আগে থেকে চিনতেন কি না, এমন প্রশ্নে পরীমনি বলেন, ‘না, না না না না।’
তিনি যে নাসিরউদ্দিন সেটা কীভাবে জানলেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা ওনি বলছে। ওনি বলছে আমি এই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, এই খানের প্রেসিডেন্ট।
‘অকথ্য ভাষায় কী কী বলছে, আমি বলতে পারতেছি না ভাইয়া, আমি এই করব, সেই করব, দেখি তোকে কে আটকায়?’
আপনি কি এর আগে কখনও দেখেছেন?-এমন প্রশ্নে পরীমনি বলেন, ‘আমি তো জানতামই না যে সেখানে তারা থাকে।’
যা যা হয়েছে
ক্লাবে যাওয়ার পর কী হয়েছে, সেটা জানান পরীমনি।
বলেন, ‘একটু মুরুব্বি ধরনের মানুষ। আমি দাদা বলে সম্বোধন করে সালাম দিলাম।
‘আমাদেরকে বসতে বললেন। আমরা ওই রকম পরিবেশে বসার জন্য প্রিপেয়ার্ড ছিলাম না।
‘জিমি আমাকে বলে, দায়িত্ব আমার, আমি কথা বলছি ওদের সাথে। অন্য একদিন বসব।’
ওদের একজন তখন বলেন, ‘আরে বসেন না, গ্লাস দাও, এই সেই।’
পরী বলেন, ‘আম্মু অসুস্থ যাই।’
এরপর তাদেরকে বলা হয়, ‘ঠিক আছে, কফি খাও।
‘বলছে (ওয়েটারদের) কফি নিয়া আস।’
পরী বলেন, ‘বললাম ঠিক আছে কফি খাওয়া যায়। আমি বসে আছি। কিন্তু দেরি হচ্ছিল।
‘তখন বারবার বলছি, আরেকদিন কফি খাব, কোনো সমস্যা নাই।…কফির আগে কোক চলে আসে। কোকটা ওরা গ্লাসে ঢালে।‘
সেই কোকে কিছু একটা মেশানো ছিল বলে ধারণা পরীর। বলেন, ‘এটা কোক, কিন্তু কেমন লাগতেছে! কফিও চলে আসে।
“কফি আবার দুইটা কাপের মধ্যে মিলানো হয়। জিমি ফার্স্ট টাইম কফি আর পরে কোক ট্রাই করে। বলে, ‘এটা কেমন জানি।’
জিমি তখন বলেন, ‘আপু তুমি দেখ এটা কফি না।’
পরী বলেন, ‘আমি মুখে নিয়ে.. টিস্যু ছিল সামনে, টিস্যুতে মুখটা মুছি।’
তখন তারা রিঅ্যাক্ট করে। বলে, ‘এটা বোট ক্লাবের কফি, মুছে ফেললেন?’
পরী তখন `সরি’ বলেন।
জিমি তখন বলেন তিনি, বাথরুমে যাবেন।
পরী বলেন, ‘আমাকে বসায়ে রেখে বলে, আরে আপনি কেন যাবেন, এমন বলে জিমিকে নিয়ে দুই জন বাথরুমে গেল।
‘কয়েক মিনিট পরে জিমি চিল্লাতে চিল্লাতে বাথরুম থেকে বের হলো।
‘ওইটা দেখার পর আমি আর কোনো কথা বলতে পারি নাই’ এটুকু বলে কাঁদতে থাকেন পরীমনি। কিছুক্ষণ নীরবে কাঁদেন। পরে কাঁদতে থাকেন উচ্চস্বরে।
বলেন, ‘(জিমিকে দেখে) কেউ বলতে পারত না। আমি শকড হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বসেছিলাম।‘
জিমি তখন পরীকে বলেন, ‘আপি চলো, আপি চলো, আমাকে বাসায় নিয়ে যাও।’
পরী বলেন, ‘ওর অবস্থা আমি আপনাদেরকে বলতে পারতেছি না ভাইয়া, এটা বলে আবার কাঁদতে থাকেন।
এক পর্যায়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে পরী বলতে থাকেন, ‘যখন আমি উঠে চলে আসতেছি, তখন আমার চেয়ারের ওপরে চেয়ারে… চেয়ারের মধ্যে লাত্থি মেরে… আমি চলে আসি পেছনে।’
কিছুক্ষণ থেমে আবার কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘লাইনগুলো কীভাবে বলতে হবে, আমি না আসলে বলতে পারতেছি না।’
এরপর পরী আবার উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকেন। চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমি বলতে পারতেছি না, আমি বলতে পারতেছি না।’
পরে আবার বলেন, ‘আমি কারে বলব?’
তখন পরীকে বলা হয়, ‘তুই কি মদ খাস না?’
পরী আবার বলেন, ‘আমি বলতে পারতেছি না, ভাইয়া আমাকে মাফ করেন।’
‘আম্মু আমি পারব না’-পাশে থাকা নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরীকে লক্ষ্য করে বলেন পরীমনি।
চয়নিকা বলেন, ‘না বললে তো ওরা জানবে না।’
পরী বলেন, ‘আমি কেমনে বলব? এটা ওরা বুঝছিল যে আমি বলতে পারব না, আমি চুপ হয়ে যাব। আমি কেমনে বলব?’
সেদিনের ঘটনায় আবার ফিরে যান পরীমনি।
বলেন, ‘চেয়ারের ওপরে এখানে পা তুলে দিছে। আমার দাঁত এখনও নড়তেছে। এখনও ব্যাথা, বোতল মুখে ভরে দিছে, মদ খাইতে হবে।’
আবার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার নাক দিয়া বের হইছে।’
সে সময় পরীকে হত্যার হুমকি দেয়া হয় বলে জানান তিনি। বলেন, ‘বলছে, এইখানে ডোবা আছে, কাইটা তিন শ টুকরা কইরা ভাসায়া দিব।
‘বেনজীর আহমেদ তোর বাপ লাগে? তোরে বাঁচাইব? তোর বেনজীর আহমেদরে ফোন দে’- এই কথা বলে সেই ব্যক্তি তার ফোন ছুঁড়ে মারেন পরীমনির দিকে।
এর আগে সঙ্গে থাকা জিমির ফোন তারা ফেলে দেয়। কারণ, তিনি ভিডিও করছিলেন।
পরী বলেন, ‘জিমিরে অনেক মারছে ভাইয়া।’
তখন জিমিকে উদ্দেশ্য করে আজেবাজে কথা বলা হয়।
পরী বলেন, ‘এই কে এই হিজড়া-জিমিকে এসব এসব কথা বলছে।
‘বলে বামেরটা ভালো লাগে, ডানেরটা ভালো লাগে?’
পরীমনি তখন বলেন, ‘আমি বলতে পারব না, মারেন, মারেন, মাইরা ফালান না কেন। আমি অ্যাকটিং করি। আমাকে মাইরা ফেলেন ভাইয়া, এই দিন আমি দেখতে চাই না। আমি জানি না এই দিন আসবে। আমারে মাইরা ফেলেন ভাই।’
পরীমনি বলেন, তাকে বলা হয়, ‘ন্যাকামি করস, ন্যাকামি করস?
‘এখানে খাইতে পারবি না, নিতে পারবি না, কী কী বলছে, আমি না বলতে পারতেছি না ভাইয়া, আমার বলতে ইচ্ছা করতেছে না, আমি বলতে পারতেছি না’-এটা বলে আবার ডুকরে কাঁদতে থাকেন পরীমনি।
পরে বলেন, ‘আপনারা ৫ মিনিট কেমনে দেখতেছেন। আমি চার দিন ধরে.. আমি পাগল হয়ে গেছি ভাইয়া। আমি সুস্থ নাই মানসিকভাবে। আমি না পাগল হয়ে গেছি ভাইয়া, আমি পাগল হয়ে গেছি। আমার জায়গায় থাকলে আপনারা কেউ কথা বলতে পারতেন না।’
