ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মির্জা আব্বাসের বক্তব্যে বিএনপিতে তোলপাড়

নজর২৪ ডেস্ক- নিখোঁজ হওয়ার নবম বছরে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তার দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার নয়, ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে বিএনপিই।

 

ঢাকাস্থ সিলেট বিভাগ জাতীয়তাবাদী সংহতি সম্মেলনীর উদ্যোগে ইলিয়াস আলীর সন্ধানের দাবিতে শনিবার (১৭ এপ্রিল) ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় আব্বাসের এমন মন্তব্যে দলের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

 

সরকার ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে এতদিন ধরে দলটির পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ থাকলেও বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতার এই বক্তব্যে নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

 

মির্জা আব্বাসের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে বেশ কয়েকজন অনীহা প্রকাশ করেছেন।

 

মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এক নেতা বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে আমরা কোনো বক্তব্য দিতে পারি না, যদি কিছু বলার থাকে দলীয় ফোরামে বলব। আমার সঙ্গে কথা বলেছেন দয়া করে এটা আপনি উল্লেখ করবেন না আপনার প্রতিবেদনে।’

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘আজকে আমরা দেখলাম ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় মির্জা আব্বাস তার সবচেয়ে প্রিয় ভক্ত ইলিয়াস আলীকে স্মরণ করতে অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছেন। তার বক্তব্য ভারী হয়ে আসছিল। দীর্ঘ ৯ বছর পর তিনি একটি তথ্য পাবলিকলি দিয়েছেন। এটা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নানান ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। তিনি এতদিন কেন এটা বলেননি? ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ইস্যুতে যেখানে সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে, সেখানে মির্জা আব্বাস এই মুহূর্তে কেন সেটা বিএনপির ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন, এটা নিয়ে নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’

 

‘দলের এই করুণ পরিস্থিতিতে মির্জা আব্বাস কি তাহলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইলিয়াস আলীর সেন্টিমেন্ট নিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চাইছেন? যেখানে বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান সংস্কারপন্থীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। সেখানে তিনি এত বছর পরে এসে এই বিস্ফোরক ছেড়ে কী অর্জন করতে চাইছেন? হাজারো প্রশ্ন নেতাকর্মীদের মনে।’

 

তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ মনে করেন মির্জা আব্বাস পাবলিকলি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে সংস্কারপন্থীদের ধমকের মাধ্যমে ইলিয়াস আলীর অনুগামীদের একদিকে যেমন সন্তুষ্ট করেছেন, অন্যদিকে সরকারের অভিযোগ বিএনপির কাঁধে চাপিয়ে সরকারকেও সন্তুষ্ট করেছেন। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলে তার অন্যান্য জায়গায় সমস্যা হয় কিনা সেটাও বোঝার চেষ্টা করছেন নেতাকর্মীরা।’

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক যুগ্ম মহাসচিব বলেন, ‘মির্জা আব্বাস স্পষ্টবাদী একজন মানুষ। তিনি যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী শক্তির অপতৎপরতা দলের মধ্যে রয়েছে। তিনি হয়তো গুছিয়ে বলেননি। সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন, নিশ্চয়ই সেখানে স্পষ্ট করবেন।’

 

ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের জড়িত থাকার কথা বলে মির্জা আব্বাসের যে বক্তব্য প্রচার হয়েছে সেটাকে তিনি খণ্ডিত বলে একটি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন।

 

মির্জা আব্বাস দাবী করেছেন, ‘ইলিয়াস গুম হওয়ার আগের রাতে দলীয় অফিসে কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডা হয়। তখন ইলিয়াস খুব গালিগালাজ করেছিলেন তাকে। সেই যে পেছন থেকে দংশন করা সাপগুলো, আমার দলে এখনো রয়ে গেছে। যদি এদের দল থেকে বিতাড়িত না করেন, তাহলে কোনো পরিস্থিতিতেই দল সামনে এগোতে পারবে না।’

 

তারা কারা। কার সঙ্গে আগের রাতে বিএনপি অফিসে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল ইলিয়াস আলীর- দলের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন। তাদের প্রশ্ন, এই ধরনের ষড়যন্ত্রকারীদের দলে রেখে দলের ভবিষ্যত কী। ষড়যন্ত্রকারীরাই কি তাহলে এতদিন দলকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে?

 

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, যে মুহূর্তে দলের নতুন নেতৃত্ব সংগঠনকে গুছিয়ে আনছেন, সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করা চেষ্টা করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মির্জা আব্বাসের বক্তব্য নতুন করে সন্দেহ-উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করবে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি কাকে ফাঁসিয়েছেন বা কার দিকে ইঙ্গিত করেছেন সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। ৯ বছর পর সরকারের হাতে রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দেয়া কতটা বুদ্ধিমানের কাজ তা বলা বাহুল্য বলে সূত্র জানিয়েছে।

 

তবে রোববার (১৮ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় মির্জা আব্বাস শাজাহানপুরের বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। দফতর সূত্র জানিয়েছে, মির্জা আব্বাস এ বিষয়ে তার বক্তব্য স্পষ্ট করবেন।

 

এদিকে মির্জা আব্বাসের এই বক্তব্যের ব্যাপারে ওই আলোচনায় যুক্ত থাকা ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, এমনকি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

 

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী থেকে গাড়ি চালক আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী। তার পরিবার ও বিএনপির অভিযোগ, এই নেতাকে ‘গুম’ করে রেখেছে সরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *