রাজনৈতিকভাবে নয়, হেফাজতকে সামলাতে এবার কৌশলী সরকার

নজর২৪ ডেস্ক- হেফাজতে ইসলামকে মোকাবিলায় এবার কৌশলী হয়েছে সরকার। অতীতের সমঝোতার কৌশল থেকে কিছুটা সরেও এসেছে। দেখিয়েছে কঠোরতা। দলটিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে তাদের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ওপর ভর করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

 

পাশাপাশি হেফাজতের জ্বালাও-পোড়াও ও ভাংচুরের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতনও করতে চায় সরকার। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নানা সূত্রে জানা গেছে এসব কথা।

 

২০১৩ সালের ৫ মে’র শাপলা চত্বরের ঘটনার পর হেফাজত ইস্যুতে কিছুটা সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছিল ক্ষমতাসীনরা। মাদ্রাসা শিক্ষার সনদের স্বীকৃতিসহ কওমি মাদ্রাসাকে নানা সুবিধাও দেওয়া হয়েছিল তখন। বলতে গেলে হেফাজতের সঙ্গে কিছুটা সখ্যতা গড়ে ওঠে সরকারের।

 

সেই পথে হেঁটে গত সাত বছর হেফাজতকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল। তবে, গতবছর শেষ দিকে দেশের কয়েকটি স্থানে জাতির জনকের মুর‌্যাল স্থাপনকে কেন্দ্র করে হেফাজত ফের সক্রিয় হয়। তখনও ধৈর্য দেখিয়ে ও কৌশলী হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেখা যায় সরকারকে। তবে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে হেফাজত তাণ্ডবের পর কঠোর অবস্থান নেয় প্রশাসন। তাণ্ডবে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।

 

জানা গেছে, সরকারি দল চায়, অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, বিলাসী জীবন, ব্যক্তিগত জীবনে অনৈতিক আচরণ ইত্যাদি ইস্যুতে হেফাজতের দায়িত্বশীলদের আসল চরিত্র উন্মোচিত হোক। নারী কেলেঙ্কারির ঘটনার জের ধরে মামুনুল হকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা দলটির নৈতিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ বলে সরকারি দলের নেতারা মনে করেন।

 

এ ছাড়া হেফাজত সমর্থক রফিকুল ইসলাম মাদানীর মোবাইলে অশ্লীল ভিডিওচিত্র এবং নারীঘটিত ইস্যু বেরিয়ে আসায় হেফাজত নেতাদের সম্পর্কে ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে নতুন বার্তা যাবে বলে আওয়ামী লীগ মনে করে।

 

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হেফাজতের আমির-মহাসচিবসহ ৫৪ নেতার ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। একইসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি পুনর্বিবেচনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন হেফাজতের আন্দোলন দমানোর বড় কৌশল হিসেবে এবার এ দুটো বিষয়ও কাজ করবে।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, স্থানীয় জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী গণ্ডগোল বাঁধিয়ে রাখার জন্য ভূমি অফিসের সব কাগজ পুড়িয়ে দিয়েছে হেফাজত। তারা আন্দোলনের নামে যে তাণ্ডব চালিয়েছে তা ইসলাম সমর্থন করে না।

 

মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাদের চরিত্র আপনাতেই বেরিয়ে এসেছে। সরকারকে কিছু করতে হয়নি। তবে, আমাদের কাজ হবে হেফাজতের নাশকতা ও কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো মানুষকে জানানো। তারা ধর্মকে কলুষিত করছে। ইসলামের নামে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড যারা করে তারা ইসলামের ধারক-বাহক হতে পারে না। আমরা চাই দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ জানুক কাদের উস্কানিতে তাদের শিশু-সন্তানরা কথিত জেহাদের নামে রাস্তায় নেমে অন্ধকার জীবনের দিকে যাচ্ছে।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বেছে বেছে সরকারি স্থাপনার ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। এর পেছনে বিএনপি-জামায়াতের স্পষ্ট মদদ রয়েছে।

 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক হলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার প্রশ্ন আসতো। তাদের তো কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। তারা যেটা করছে পুরোটাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আইনের যথাযথ প্রয়োগ করেই তাদের মোকাবিলা করা হবে।’

 

আওয়ামী ওলামা লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব মুফতি মাসুম বিল্লাহ নাফেয়ী বলেন, আহমদ শফী থাকাকালে হেফাজতের সাথে সরকারের সুসম্পর্ক ছিল। উনি মারা যাওয়ার পর হেফাজতের নতুন যে কমিটি হয়েছে, ওই কমিটির সাথে সরকারের সম্পর্ক ভালো না। আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীসহ তার সমর্থকরা হেফাজতে ইসলামে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। হেফাজতের নীতি-নির্ধারকদের ওপর ওই অংশের কোনো প্রভাব নেই।

 

তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যেও একটি অংশ হেফাজতে ইসলামের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; যে কারণে হেফাজত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করলেও দল ও সরকারের পক্ষ থেকে কিছুটা শিথিলতা দেখানো হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তাদের কাছে টানতে চেয়েছিল সরকার। কিন্তু শেষমেশ হেফাজতের মোদি বিরোধী আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়ায় সরকার নমনীয় নীতি থেকে সরে এসে কঠোর অবস্থানে চলে গেছে।

 

হেফাজতের ব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোর কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি কঠোর অবস্থানে যাবো। জেলা পর্যায়ে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বসে যেখানে যা প্রয়োজন, তারা সে ব্যবস্থা করবেন।

 

হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি অপরাধ করলে মামলা তো হবেই, মামলা মামলার গতিতে চলবে। সেখানে কারো হাত নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চিহ্নিত নাশকতাকারীদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *