নজর২৪ ডেস্ক- ডাকসু ভবনে ভিপি নুরুল হক নুর ও তার সহযোগীদের উপর হামলার ঘটনায় কোনো সাক্ষীর জবানবন্দি না দিয়েই চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে৷ তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, আহতদের মেডিকেল সার্টিফিকেট না পাওয়ায় কারুর সাক্ষী নেয়া হয়নি৷
তবে সাক্ষী না নিলেও ওই দিনের ঘটনাকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি, ঠেলাঠেলি, ধাক্কধাক্কির এক পর্যায়ে কয়েকজন পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন৷ খবর- ডয়চে ভেলে’র
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরে ২২ ডিসেম্বর ডাকসু ভবনে ভিপি নুরুল হক নুর ও তার সহযোগীদের ওপর হামলা হয়৷ এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন৷ আহতদের মধ্যে নুরসহ কয়েকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক সপ্তাহ চিকিৎসা নেন৷ ঘটনার দুই দিন পর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের একাংশের সভাপতি আমিনুল ইসলামসহ আট জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই রইছ হোসেন৷
পরে নুরও আলাদা একটি মামলা করেন৷ মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনসহ ৩৭ জনকে আসামি করা হয়৷ পুলিশ নুরের মামলা আলাদাভাবে না নিয়ে দুইটি এজাহার একসাথে তদন্ত করে৷ তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় ডিবিকে৷
গত ১০ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ইন্সপেক্টর শাহ মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলার আসামিদের অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করেছেন৷ ১৩ জানুয়ারি সিএমএম আদালতে শুনানি হবে৷
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘‘আমি এই মামলায় আহতদের মেডিকেল সার্টিফিকেট পাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি৷ নুরের কাছে তাদের হাসপাতালে ভর্তির কাগজপত্রও চেয়েছি৷ হাসপাতাল আমাকে মেডিকেল সার্টিফিকেট দেয়নি৷ লিখিত আবেদন করেও পাইনি৷ তারা বলেছে ভর্তি স্লিপ না পেলে মেডিকেল সার্টিফিকেট দেয়া সম্ভব না৷ আর এই মামলায় মেডিকেল সার্টিফিকেট না পেলে আর কোনো তদন্ত করে লাভ নাই৷ আমাকে মামলা তো শেষ করতে হবে৷ তাই চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছি পরে কখনো যদি মেডিকেল সার্টিফিকেট পাওয়া যায় তাহলে মামলা পুনরুজ্জীবিত করা যাবে৷’’
তিনি স্বীকার করেন এই মামলায় তিনি আহত বা প্রত্যক্ষদর্শীদের কোনো সাক্ষ্য নেননি৷ তার দাবি, ‘‘মেডিকেল সার্টিফিকেট ছাড়া এই ধরনের মামলার তদন্ত করে কোনো লাভ নাই৷ সার্টিফিকেটই মূল৷ সেটা যখন পাওয়া যায়নি তাই সাক্ষীও নেইনি৷’’
নুরুল হক নুর বলেন, ‘‘আমাদের চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই ঢাকা মেডিকেল থেকে জোর করে বের করে দেয়া হয়৷ আমাদের শুধু ওষুধ লিখে দেয়া হয়েছে৷ আর কোনো কাগজ দেয়া হয়নি৷ আমাদের যে এত টেস্ট করানো হলো তার কোনো ডকুমেন্ট দেয়া হয়নি৷ আর তদন্ত কর্মকর্তা মাত্র একদিন আমাকে ফোন করেছিলেন৷’’
নুরের কথা, ‘‘হাসপাতালে তো আমাদের ভর্তির রেকর্ড আছে৷ তাহলে মেডিকেল সার্টিফিকেট কেন হাসপাতাল দিতে পারবে না৷ আসলে উপরের চাপে এরকম করা হয়েছে৷ আমরা এই সরকারের আমলে বিচার নাও পেতে পারি৷ কিন্তু যেভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে একদিন আমাদের ওপর সব হামলারও বিচার হবে৷
‘‘আর মেডিকেল সার্টিফিকেট যদি কোনো কারণে না-ই পাওয়া যায় তারপরও তো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আছে, সাক্ষী আছে৷ আমরা আহতরা আছি৷ সেটা ধরেও তো তদন্ত করা যেত৷
‘‘আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, আরো একটি ছেলের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়৷ ফারাবি আইসিইউতে ছিলো৷ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আদিবের কিডনি ড্যামেজ হওয়ার পথে ছিলো৷ আমরা ছোট ভাই এক সপ্তাহ ধরে সেন্সলেস ছিলো৷ তারপরও তদন্ত কর্মকর্তা এটাকে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা কীভাবে বলে?’’ প্রশ্ন নুরের৷
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক বলেন, ‘‘ঘটনার সময় আমি পরিচালক ছিলাম না৷ আমার কাছে আবেদনও করা হয়নি৷ আমি যোগ দিয়েছি কয়েকদিন হলো৷ তবে তদন্ত কর্মকর্তা যদি এখন আবেদন করেন আমি চেষ্টা করব একটা ব্যবস্থা করার৷’’
তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসার সব রেকর্ড থাকে৷ রোগীর ছাড়পত্র পাওয়া না গেলেও তারিখ ধরে সব রেকর্ড বের করা সম্ভব৷’’
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘‘আমার কাজ শেষ৷ যদি আবার মেডিকেল সার্টিফিকেট পাওয়া যায় তাহলে আদালত নতুন কাউকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন৷’’
আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘‘মেডিকেলে সার্টিফিকেটকে আইনে বলা হয় মতামত৷ আর প্রত্যক্ষদর্শী বা আলামত হলো মূল সাক্ষ্য প্রমাণ৷ মেডিকেলে সার্টিফিকেট মামলা তদন্তের জন্য অপরিহার্য নয়৷ মেডিকেল সার্টিফিকেট পাওয়া যায়নি এই অজুহাতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য না নিয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া যায় না৷’’
নুর বলেন, ‘‘শুরুতে আমরা মামলা করতে চাইলেও মামলা করতে দেয়া হয়নি৷ পুলিশ মামলা করে৷ তখনই এই মামলার পরিণতি বোঝা গেছে ৷ তারপরও আমরা এর বিরুদ্ধে আদালতে যাব৷’’
প্রসঙ্গত, ঘটনার চার দিন পর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিএম সাব্বির নুরসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন৷ নুরের মামলার পর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি মামুনসহ তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তারা আগেই জামিনে ছাড়া পান৷
