স্পোর্টস আপডেট ডেস্ক- একজন মানুষ কতটা জনপ্রিয় হলে তাবৎ দুনিয়ার সংবাদমাধ্যম তার প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করে, তাকে দেখামাত্রই জ্বলে উঠে হাজারো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট, ক্লিক ক্লিক ধ্বনিতে মুখর হয় অত্র চত্বর!
একজন খেলোয়াড়ের জীবন কতাটা বর্ণাঢ্য হলে অবসরের পরেও তিনি থাকেন পাদ প্রদীপের আলোয়! যেখানেই যান সংবাদমাধ্যম ও ভক্তকুল হালের বিশ্বসেরা মেসি, নেইমার, রোনালদোদের মাঠের ক্যারিসমা উপেক্ষা করে তার প্রতিটি মুভ দেখতেই উতলা হয়ে থাকেন।
যাপিত জীবনে আর্জেন্টাইন যাদুকর ডিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন এমনই এক মানুষ, এমনই এক খেলোয়াড়। ফুটবল দুনিয়ার অপার বিস্ময়ের নাম ম্যারাডোনা, এক উন্মাতাল অনুভুতির নাম ম্যারাডোনা।
দৈনিক ইনকিলাবের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি শামীম চৌধুরী গিয়েছিলেন ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ কাভার করতে। বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে ম্যারাডোনার জনপ্রিয়তা বর্ণনা করতে গিয়ে বলছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার ম্যাচে ম্যারাডোনা খেলা দেখতে এলেন। মাঠে ছিল অগনিত ক্যামেরা। মজার ব্যাপার হলো এর ৫০ শতাংশই ম্যারাডোনার দিকে তাক করা ছিল। তিনি কখন কি করেন, বলেন; এমকি গোলের পরে কিংবা গোলের সুযোগ তৈরি হলেও তার যে প্রতিক্রিয়া তা ফ্রেমবন্দি করাই ছিল তাদের কাজ।’
সেই ম্যারাডোনা আজ পরপারের বাসিন্দা। নভেম্বর তার মস্তিস্কে অস্ত্রোপচারের পর অতিমাত্রায় মদ্যপ নির্ভরতা কমাতে চিকিৎসা করে আসছিলেন চিকিৎসকেরা। পাছে উদ্দেশ্য একটাই। কিংবদন্তিকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। কিন্তু তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২১ মিনিটে ৬০ বছর বয়সে আর্জন্টিনায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন ‘ফুটবল ঈশ্বর’।
বুধবার তার জীবন প্রদীপ যখন নিভে যাওয়ার খবর চাউর হলো। তাবৎ দুনিয়া যেন একটা ছোট্ট গ্রাম হয়ে গেল। শত শত কোটি মানুষ ভাসল একই আবেগে! আর কারো জন্য কখনো এমন হয়েছে কি! শৈশবে দারিদ্র্য, ফুটবল প্রেম। কৈশোরে নাম কুড়ানো, তারুণ্যে দুনিয়া মাত। বাকি জীবনটাও তার তারুণ্যই। ম্যারাডোনা চেনা পথে হেঁটে একটাই জীবন পার করেননি। জীবনকে নিয়ে খেলেছেন বিস্তর। এক জীবনে পেয়েছেন বহু জীবনের স্বাদ।
বিশ্বের বাকি আর দশটি দেশের মতো এদেশেও এর ব্যতিক্রম চোখে পড়েনি। ভক্তহদয়ে হচ্ছে রক্তক্ষরণ, চলছে শোকের মাতম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই চোখে পড়ছে তাদের আহাজারি। যেন খুব কাছের কাউকে হারিয়েছেন।
বাংলাদেশের মানুষের ফুটবল প্রেম পুরনো। কিন্তু কোনও দলকে নতুন করে ভালোবাসতে শুরু করা, সেই দলের সমর্থনে নিজের সবকিছু উজাড় করে দেওয়া- সবকিছুই বুঝি এই একজনের কল্যাণেই। ক্ষ্যাপাটে কিংবা পাগলাটে, যাই বলুন না কেন, এক ম্যারাডোনাই আর্জেন্টিনার ফুটবলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যার রেশ এসে পড়েছে এই বঙ্গদেশে।
’৮০-এর দশকে বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশন মাত্র আসতে শুরু করেছে। ওই সময়ই ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে। মেক্সিকোর সেই আসর দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল বাংলাদেশের অনেকেরই। প্রায় একাই প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিয়ে দলকে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি এনে দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। তার ফুটবল মেধা-দক্ষতায় বিমোহিত এ দেশের ফুটবলপাগল মানুষেরা।
এর আগে ১৯৭৮ সালে দানিয়েল পাসারেলার হাতে ওঠে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ। সেবার বাংলাদেশের খুব বেশি মানুষের খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে ৮৬-তে প্রযুক্তির উৎকর্ষে সুযোগ হয় বিশ্বকাপ দেখার, আর ওই বিশ্বকাপেই ম্যারাডোনা নিজেকে চেনালেন, চেনালেন আর্জেন্টিনাকে।
সেই শুরু। এরপর থেকে আর্জেন্টিনা প্রেম বাড়তেই থাকলো। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ট্রফি ধরে রাখতে পারলেন না। পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হারতে হয় ফাইনালে। ম্যারাডোনার সেই কান্না হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো ছিল। বাংলাদেশের অগণিত আর্জেন্টিনা ভক্তের চোখ গড়িয়েছি এসেছিল জলধারা।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে তো মাদককাণ্ডে ম্যারাডোনা খেলতেই পারলেন না। তারপরও আশায় বুক বেঁধে সমর্থকরা সমর্থন করে গেছেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার ঘরে ওঠেনি ট্রফি। ম্যারাডোনার পর অনেক তারকাই এসেছেন। হালের লিওনেল মেসিসহ অনেকেই। আসলে ম্যারাডোনায় মুগ্ধতা থেকে শুরু হওয়া আর্জেন্টিনা প্রেমের কারণেই লাতিন দেশটির তারকারা বাংলাদেশের ফুটবলভক্তদের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নেন।
একটি দেশকে ভিন্ন মহাদেশে জনপ্রিয় করার পেছনে ম্যারাডোনার অবদান বলে শেষ করা যাবে না। আরেক কিংবদন্তি পেলের কারণে ব্রাজিল যেমন এই দেশে জনপ্রিয়, তেমনি ম্যারাডোনার কারণে আর্জেন্টিনা। এই দেশের মানুষকে নতুন করে ফুটবল ভালোবাসতে শিখিয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর।
উল্লেখ্য, মাত্র কয়েকদিন আগেই রক্ত জমাট বেধে যাওয়ায় মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর ডাক্তাররা তাকে পূনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে হৃদরোগে আক্রান্ত আর্জেন্টাইন এই কিংবদন্তি। যেখান থেকে আর ফিরলেন না তিনি।
ম্যারাডোনার বিদায়ে ফুটবল বিশ্ব হারাল এক বর্ণিল চরিত্রকে, এক সাফল্যে মোড়া কিংবদন্তি ফুটবলারকে। ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর বুয়েন্স আয়ার্সের লানুসে অবস্থিত পলিক্লিনিক এভিটা হাসপাতালে জন্ম নেয়া ম্যারাডোনা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ২০২০ সালে ২৫ নভেম্বর বুয়েন্স আয়ার্সে তিগ্রের নিজ বাসায়।
নিজের ৬০ বছরের জীবনে ফুটবল খেলে কাটিয়েছেন ২১ বছর, ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আরও প্রায় ৭ বছর। জীবনের মোট ২৮ বছর যেই ফুটবল মাঠের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন ম্যারাডোনা, সেই খেলাটি তাকে দিয়েছে দুই হাত ভরে। জিতেছেন ফুটবল বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে নিজেকে নিয়ে গেছেন সবার ওপরে।
