বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নূতন। শৈশবে গান দিয়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হলেও পরবর্তীতে নৃত্য এবং মঞ্চ অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন নূতন। প্রথম ছবিতেই তিনি সফলতা লাভ করেন।
তবে সত্তর-আশির দশকের জনপ্রিয় এই নায়িকা বর্তমানে অভিনয়ে নিয়মিত নন, তাই নিয়মিত আসেন না এফডিসিতেও। সর্বশেষ তাকে এফডিসিতে দেখা যায় শিল্পী সমিতির নির্বাচনের ভোটের দিন। অথচ এক সময় এফডিসি নতুন নতুন সিনেমার শুটিং নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকতেন তিনি।
চলচ্চিত্রের বর্তমান দুর্দশার পেছনের কারণ হিসেবে ইন্ডাষ্ট্রির মানুষের অজ্ঞতাকেই দায়ি করলেন। একই সঙ্গে জানালেন নির্বাচন আর নেতা হওয়ার দিকে মনোযোগই এই ইন্ডাষ্ট্রিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমকে নূতন বলেন, আমি মারা গেলে আমার সঙ্গে যেন তোমার-তোমাদের কোনো না-কোনো স্মৃতি মনে পড়ে এ কারণেই আমি সবার সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাই, চলাফেরা করি। সিনেমা ছেড়ে দেওয়ার পর্যায়ে আমরা এখন চলে এসেছি; সিনেমার কথা হয়তো ভুলেও যাবে, তবে আমার ব্যবহার থেকে যাবে সারাজীবন। সম্ভব হলে আমি ১৮ কোটি মানুষের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতি ধরে রাখতাম। যদিও আমি জানিয়ে দিয়েছি- মারা গেলে যেনো এফডিসিতে আমাকে না নেওয়া হয়। আর কেউ যেন আমাকে নিয়ে মায়াকান্না না কাঁদেন। আমার জন্য মন থেকে একজন মানুষ দোয়া করলেও আমি স্বার্থক।
যে এফডিসিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এতো এতো স্মৃতি। অথচ মৃত্যুর পর লাশ এফডিসি প্রাঙ্গণে নিতে না করছেন। এর পেছনে ক্ষোভ বা কষ্ট আছে নিশ্চয়ই।
জানতে চাইলে নূতন বলেন, এটা তোমাদের খুঁজে বের করতে হবে। নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছি। একজন শিল্পী এত বছর এই এফডিসিতে কাজ করেছে, যার জীবনটাই এখানে কেটেছে। যার ভালোবাসা এখানে দিয়েছে সে এ কথা কখন বলে? নিশ্চয়ই সে সেরকম কোনো আঘাত পেয়েছে বলেই কথাটা বলছে। মানুষের যতটুকু ভালোবাসা পেয়েছি এর থেকে উপরি কিছু চাইনি, চাইবোও না।
চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলেন, স্পষ্টবাদী হওয়া এখন অপরাধ। এখানে স্পষ্ট কথা বলা যায় না। আমি অনেক সময় অনেক কথা বলে ফেলতাম। সিনিয়ররা বলতেন- নূতন তুমি ঠিক বলেছ। এখন তো কেউ কারো কথাই শোনে না। আমাদের মধ্যে কখনও কোন্দল কাদা ছোড়াছুড়ি হয়নি। আমাদের মধ্যে যেটা হয়েছে চুপচাপ সবাই বসে সমাধান করে ফেলতো। হঠাৎ করেই কেন যেন সব পাল্টে গেল! মনে হচ্ছে এফডিসি কিছু না, অভিনয়ের দরকার নেই, সিনেমা হলের কি অবস্থা, সিনেমা নেই, শিল্পীদের সবাই হাহাকার করছে- এসব নিয়ে কোনো কথাই নেই। সবাই কি গিয়ে বলবে- ভাই আমার খাবার নেই৷ সব শিল্পীই কি কোটি টাকা নিয়ে বসে আছে? এটা ভুল ধারণা। এখন চেয়ার নিয়ে টানাটানি করছে। সবাই তো একসঙ্গে ছিল। সবাই মিলে সমাধান করা যেত। কেন বাহিরের লোক জানবে? কেন বাহিরের লোক এগুলো নিয়ে ছি ছি করবে? যারা আমাদের ছবি দেখে আমাদের ভালোবাসে, তাদের মুখে এখন আমরা ছি ছি’র পাত্রী!
নূতন বলেন, আমাদের স্বপ্নের এই ইন্ডাষ্ট্রির এতো দ্রুত ধ্বংস দেখতে হবে ভাবিনি। ২০০০ সালে একদল রাজাকার এই চলচ্চিত্র ধ্বংস করতে চেয়েছিলো। কিছুটা সফলও হয় তারা। যারা এখন প্রয়াত। ২০১৬ সালের পর এসে একদল নব্য রাজাকার আবারও এই ইন্ডাষ্ট্রি ধ্বংস কতে মরিয়া। শিল্প আর শিল্পীদের ও সত্যিকার সিনেমা প্রেমীদের পেটে যারা নিজেদের স্বার্থে লাথি দিলো তাদের বিচার অতি নিকটে হবে।
নূতন বলেন, আমরা দুস্থ শিল্পী হয়ে কাজের ক্ষুধায় এ দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে ঘুরছি। আর একদল শুধু চেয়ারের লোভে এ রুম থেকে ওই রুমে। আমি সাউথ এর মেয়ে। আমার ভারতের ফিল্ম করার কথা ছিলো। কিন্তু আমি এ দেশেই ক্যারিয়ার গড়ি। অথচ আজ চলচ্চিত্রের অবস্থা দেখলে কান্না আসে। তবে আজ বেঁচে থাকলে এমনটি হতো না। আমরা ১৮০০ থেকে ২০০০ হলে ছবি চলা নায়ক নায়িকা অথচ আজ আমাদের সবার নির্মমতা যে কাজ নেই, হল নেই, আমাদের নিয়ে ভিন্ন চরিত্রায়ণ হয় না।
