টিপু খুন আ.লীগ নেতার পরিকল্পনায়, চুক্তি হয় ১৫ লাখ টাকায়

ঢাকার শাহজাহানপুরে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু খুনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে ক্ষমতাসীন দলটিরই স্থানীয় এক নেতাকে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে র‌্যাব। তিনি হলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক।

তিনিসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের পর শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল-মঈন বলেছেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে টিপু হত্যাকাণ্ড ঘটে।

গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলেন- নাসির হোসেন ওরফে কিলার নাসির, সালেহ সিকদার ও পলাশ।

এর আগে ওই হত্যা মামলায় মাসুম মোহাম্মদ আকাশ ও আরফান উল্লাহ দামাল দুজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ; যারা এখন রিমান্ডে রয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সব মিলিয়ে ছয়জন গ্রেপ্তার হলেন।

খন্দকার আল মঈন জানান, র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‍্যাব-৩ এর অভিযানে গতকাল শুক্রবার রাতে রাজধানীর মুগদা, শাহজাহানপুর ও মিরপুর এলাকা হতে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে নজরদারির কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং হত্যার জন্য দেওয়া ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও মোবাইলসহ অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।

র‍্যাবের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি শিকার করেছেন।

খন্দকার আল মঈন জানান, গ্রেপ্তারকৃত মোরশেদুল আলম এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য ফারুক ও মুসাকে ফোনে কয়েকজন আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সমন্বয়ের জন্য মুসা গত ১২ মার্চ দুবাই যায়। সেখানেই হত্যাকাণ্ড সংঘটনের চূড়ান্ত সমন্বয় করা হয়। হত্যাকাণ্ডটি দেশে সংঘটিত হলেও দুবাই থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দেশ থেকে কিলার নাছির, কাইল্লা পলাশসহ আরও কয়েকজন জাহিদুল ইসলাম টিপুর অবস্থান সম্পর্কে বেশ কয়েক দিন যাবৎ মুসার কাছে তথ্য পাঠাতেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর গ্রেপ্তারকৃত কিলার নাছির আনুমানিক চারবার জাহিদুল ইসলাম টিপুর অবস্থান সম্পর্কে মুসাকে জানায়। পরবর্তীতে টিপুর গ্র্যান্ড সুলতান রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় কাইল্লা পলাশ তাঁকে নজরদারিতে রাখে এবং তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তিনি ফ্রিডম মানিককে জানায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আনুমানিক রাত সাড়ে দশটার দিকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের তত্ত্বাবধানে এই হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হয়।

র‍্যাবের দাবি, গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন যাবৎ নিহত টিপু ও হত্যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে বিরোধ ছিল। মতিঝিল এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, স্কুল-কলেজের ভর্তি বাণিজ্য, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছিল। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই তারিখে গুলশান শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে মিল্কী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। মিল্কী হত্যাকাণ্ডের ৩ বছরের ভেতর একই এলাকার বাসিন্দা রিজভি হাসান ওরফে বোচা বাবু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

পরবর্তীতে গ্রেপ্তারকৃত ওমর ফারুক ও অন্যান্য সহযোগীরা স্বার্থগত দ্বন্দ্বের কারণে টিপুর অন্যতম সহযোগী রিজভী হাসানকে ২০১৬ সালে হত্যা করে।

খন্দকার আল মঈন জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ওমর ফারুকের সঙ্গে টিপুকে হত্যার জন্য হত্যাকারীদের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়। এই টাকা মধ্যে ওমর ফারুক ৯ লাখ এবং অবশিষ্ট টাকা অন্য আসামিরা দিয়েছেন। দুবাইয়ে যাওয়ার সময় মুসা ৫ লাখ টাকা নিয়ে যায় এবং হুন্ডির মাধ্যমে মুসাকে আরও ৪ লাখ টাকা পাঠায়। অবশিষ্ট ৬ লাখ টাকা দেশে হস্তান্তর করার চুক্তি হয়। উল্লেখ্য যে, মুসা ২০১৬ সালে রিজভী হাসান হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত ৩ নম্বর আসামি।

র‍্যাবের দাবি, গ্রেপ্তারকৃত ওমর ফারুক টিপু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও হত্যাকাণ্ড সংগঠনের জন্য তত্ত্বাবধান ও অর্থ লেনদেন করে। গ্রেপ্তারকৃত ওমর ফারুক ২০১৬ সালে রিজভী হাসান হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত ৪ নম্বর আসামি এবং উক্ত মামলায় সে ইতিপূর্বে কারাভোগ করেছে।

কিলার নাছির এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সময় জাহিদুল ইসলাম টিপুকে নজরদারি ও হত্যাকাণ্ডের জন্য অর্থ প্রদান করে। ঘটনাস্থলের কাছে তাঁকে সাদা শার্ট, জিনস প্যান্ট ও কেডস/জুতা পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। ঘটনার পর সে তাঁর মোবাইল ফ্লাশ করে বিক্রি করে দেয় ও সিমকার্ড ভেঙে ফেলে। র‍্যাব পরবর্তীতে ওই মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড উদ্ধার করে। এ ছাড়া ঘটনার আগের দিন সে সীমান্তবর্তী চৌদ্দগ্রাম এলাকায় একদিন অবস্থান করেছিল। সে রিজভী হাসান বাবু হত্যাকাণ্ডের ১ নম্বর চার্জশিটভুক্ত আসামি। তাঁর নামে অস্ত্র আইনে পল্লবী থানায় আরও ১টি মামলা রয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশ ঘটনার দিন জাহিদুল ইসলাম টিপুকে নজরদারি ও আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সমন্বয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। ইতিপূর্বে সে মতিঝিল থানায় অস্ত্র আইনের একটি মামলায় কারাভোগ করেছে।

গ্রেপ্তারকৃত আবু সালেহ শিকদার ওরফে শুটার সালেহ ঘটনার পরিকল্পনা ও অর্থ প্রদানের সঙ্গে জড়িত। সে রিজভী হাসান বাবু হত্যাকাণ্ডের ২ নম্বর চার্জশিটভুক্ত আসামি। তাঁর নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধে ১২টি মামলা রয়েছে এবং বিভিন্ন মেয়াদে সে কারাভোগ করেছে।

র‍্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *