নজর২৪, ঢাকা- মেজ ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইরফান সেলিম কাণ্ডে গা ঢাকা দিয়েছেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগে ছেলে ও দেহরক্ষীর বিরুদ্ধে মামলার পর তার পুরান ঢাকার দেবীদাস ঘাটের বাড়িতে সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিনভর অভিযান চালিয়েছে র্যাব। ওই বাড়ি ও তার ছেলের কার্যালয়ে চালানো অভিযানে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
হাজী সেলিম ও তার ছেলে ইরফান সেলিম পুরান ঢাকার বড় কাটরার নিজ বাড়িতেই থাকতেন। ছেলে গ্রেপ্তার এবং বাসায় অভিযান চললেও দেখা যায়নি ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) হাজী সেলিমকে। অভিযান শেষে সোমবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ তার (হাজী সেলিম) অবস্থানের বিষয়ে কিছু বলেননি।
তবে এর আগে দুপুরে আশিক বিল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, হাজী সেলিম বাড়িতে নেই। অভিযানের আগেই তিনি তার স্ত্রীসহ ডাক্তারখানায় গেছেন বলে জানা গেছে। তবে কোন চিকিৎসকের কাছে গেছেন, তা জানাতে পারেননি এ র্যাব কর্মকর্তা।
জানা গেছে, যখন র্যাব অভিযান পরিচালনা করছিল তার আগ থেকেই ওই বাসায় নেই হাজী সেলিম। ছেলের কর্মকাণ্ডে লোক লজ্জার ভয়ে গা ঢাকা দিয়ে আছেন ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিম।
হাজী সেলিমের ছেলে নিজের ক্ষমতা দেখানোর জন্য গত নির্বাচনের আগে একাধিকবার চকবাজার এলাকায় মারামারির ঘটনা ঘটিয়েছেন। ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর শহীদ হাজী আব্দুল আলিম খেলার মাঠ উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনা ঘটান ইরফান সেলিম। সেদিন মূলত ছিল নিজেকে জানান দেওয়ার শো ডাউন। ওই অনুষ্ঠানে তৎকালিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন প্রধান অতিথি ছিলেন। মাঠের নাম ফলকে হাজী সেলিমের নাম না থাকায় তার ছেলে ইরফান সেলিম দলবল নিয়ে হাজির হন সেখানে। এক পর্যায়ে কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিককে থাপ্পর মারেন হাজী সেলিম।
এভাবে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্থান হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের। পুরান ঢাকার বিশেষ করে চকবাজার এলাকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন ইরফান সেলিম। একাদশ সংসদ নির্বাচনে পিতার আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরমও তুলেছিলেন ইরফান। পরে আওয়ামী লীগ থেকে হাজী সেলিমকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন।
এমপি হতে না পারলেও জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন থেকেই যায় তার। তাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইরফান সেলিম। বাবা এমপি অন্যদিকে শ্বশুর ইকরামুল করিম চৌধুরীও একজন সংসদ সদস্য। আর নিজে কাউন্সিলর। তাই ধরাকে সরা জ্ঞান মনে করতেন ইরফান সেলিম।
আর এর সবই পেয়েছেন পিতা হাজী সেলিমের কাছ থেকে। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী থেকে সংসদ সদস্য বনে যাওয়া হাজী সেলিমও বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে এলাকার ভেতর প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
হাজী সেলিম বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় সাবেক ঢাকা-৮ আসনের বিএনপিপ্রার্থী আবুল হাসনাতকে হারালেও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যান বিএনপিপ্রার্থী নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর কাছে। এরপর সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে ওই আসনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বিএনপির নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে হারিয়ে চমক দেখান হাজী সেলিম। এরপর ২০১৮ সালে আবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা-৭ আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীকে হারান তিনি। দশম সংসদে ১৬ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নিয়ে আলাদা একটি জোট করেন তিনি। যদিও সেই জোটের কোনো কার্যকারিতা ছিল না।
তবে বিভিন্ন সময় সংসদে নানা বিষয় নিয়ে বিতর্কে জড়াতেন এই সংসদ সদস্য। একবার সংসদে আইন প্রণয়ন কাজে তৎকালিন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে তর্কে জড়ান হাজী সেলিম। তবে দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে হাজী সেলিম কথা বলতে পারেন না। শুধু ইশারায় দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন।
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে ধানমন্ডিতে সংসদ সদস্যের স্টিকারযুক্ত হাজী সেলিমের একটি গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট মো. ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর করেন ইরফান সেলিম। সোমবার ভোরে হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান, গাড়িচালক, দেহরক্ষীসহ অজ্ঞাত কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগে ধানমণ্ডি থানায় মামলা করেন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। সেই মামলায় কারাগারে কাউন্সিলর ইরফান সেলিম। আর ঘটনা থেকে নিজেকে আড়াল করতে পলাতক এমপি হাজী সেলিম।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে হাজী সেলিমের মদিনা টাওয়ারের এক সাধারণ জুয়েলারি ব্যবসায়ী গণমাধ্যমকে বলেন, এই চকবাজার এলাকায় সেলিম ও তার পরিবারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নেই। আমরা তার ভবনে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করি। কিন্তু আমাদের সঙ্গেও তার লোকেরা যে আচরণ করে তা বলার মতো না। শুধু তার ভবনেই না, আশেপাশের মার্কেট আর ভবনের ব্যবসায়ীদের নিয়মিত চাঁদা দিতে হয় তার লোকদের। নইলে এই ভবনের অনেককেই ওপরে নিয়ে যাওয়া হতো। এতদিন শুধু গুজব শুনতাম যে ওপরে যাদের নেওয়া হয় তাদের শায়েস্তা করা হয়। আজ জানলাম সেখানে টর্চার সেল রয়েছে। তার বাসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেটের এসবের আশেপাশে সরকারি সড়কে কেউ গাড়ি পার্ক করতে পারে না, বাইক রাখতে পারে না। আমাদের গ্রাহকেরা এসব মার্কেটে এসে তার লোকদের কাছে হয়রানির শিকার হয়।
বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে হাজী সেলিমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তার যে বাড়িতে র্যাব অভিযান চালিয়েছে, সেই ভবনেও তাকে পাওয়া যায়নি।
