পানির অভাবে অস্তিত্ব হারাচ্ছে রংপুরের নদ-নদী

সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর ব্যুরো: ভারত উজানে বাঁধ দেওয়ার ফলে পানির প্রবাহ না থাকায় দখলদারদের দৌরাত্ম্যে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অর্ধশতাব্দী আগেও এসব নদীতে পানির প্রবাহ ছিল। ছিল উত্তাল যৌবন ও প্রাণের স্পন্দন। এখন সেই যৌবনে ভাটা পড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে নদীর অস্তিত্ব। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরের প্রাচীনতম জনপদ রংপুর অঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় রয়েছে ধরলা, করতোয়া, দুধকুমার, জলঢাকা, সতী ঘাঘট, নীলকুমার, বাঙালি, বড়াই, মানাস, কুমলাই, ধুম, বুড়িঘোড়া, সোনাভরী, হলহলিয়া, লহিতা, ঘরঘরিয়া, নলেয়া, জিঞ্জিরাম, ফুলকুমার, কাঁটাখালী, সারমারা, রায়ঢাক, যমুনেশ্বরী, চিতনী, মরা করতোয়া, ইছামতি, আলাই, ঘাঘট, তিস্তা, কুমারীসহ প্রায় ৫০টি নদী এখন মৃতপ্রায়। এসব নদীর অধিকাংশেরই এখন নাব্যতা নেই। বর্তমানে কোনো কোনো নদীতে হাঁটুজলও শুকিয়ে গেছে। এক সময় এসব নদীর বুকে পাল তোলা নৌকায় পারাপার হলেও এখন হেঁটে চলছে মানুষ।

রংপুর জেলায় নদীর সংখ্যা অনেক। তবে অনুসন্ধান, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, রংপুর জেলায় ২৮টি নদীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

নদীগুলো হচ্ছে- তিস্তা, তিস্তা (নতুন), ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, চিকলি, শাখা চিকলি, বুল্লাই, টেপরীর বিল, মরা, নলেয়া, মানাস, ধুম, খটখটিয়া, বাইশা ডারা, আলাইকুড়ি, বুড়াইল, বুড়াইল (মীরবাগ), ইছামতি, শ্যামাসুন্দরী, খোকসা ঘাঘট, আখিরা, ভেলুয়া, কাঠগিরি, নেংটি ছেড়া, করতোয়া, সোনামতি, নলশীসা ও মাশানকুড়া।

রংপুরের এতগুলো নদী থাকলেও সবগুলোর স্বীকৃতি নেই। এই নদীগুলোর অতীত খুবই সমৃদ্ধ ছিল। প্রবীণ যারা আছেন, তাদের কাছে এসব নদীর অনেক খবর এখনো পাওয়া যায়। এ নদীগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবেই এ অঞ্চলের জনজীবনের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এখনো আছে। রংপুর শহরের চারদিকে জালের মতো ছড়িয়ে আছে এসব নদী।

নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অধীনে রাষ্ট্রীয় পরিচর্যায় নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। শতভাগ আগের অবস্থায় ফেরানো না গেলেও এখন নদীগুলো যে অবস্থায় আছে তা অবিকৃত রাখার ব্যবস্থা করা সম্ভব। এমনকি অনেক দখল উচ্ছেদ করে নদীর প্রাণপ্রবাহ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে নদীগুলো বিলুপ্তির কবল থেকে রক্ষা পাবে।

এদিকে রংপুরের আদি শহর মাহিগঞ্জ গড়ে উঠেছিল ইছামতি নদীর পাড়ে। সেই ইছামতির নামও ভুলতে বসেছে এখানকার মানুষ। অথচ এই ইছামতি ঘিরে একসময় মাহিগঞ্জ ছিল বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র। গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের বৃহত্তম বন্দর। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য বড় বড় জাহাজ আসতো এ নদীর পাড়ে। ১৮৮৭ সালের ভয়াবহ বৃষ্টিপাত আর বন্যায় তিস্তা নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করলে ইছামতির প্রবাহ কমে আসে।

রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ঐতিহ্যবাহী নদীগুলোর মধ্যে ইছামতি একটি। নদীটির সঙ্গে এ অঞ্চলের সংস্কৃতির বিকাশ, সভ্যতার বিনির্মাণ জড়িয়ে আছে। ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এ রকম নদীকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। যদি সরকার এ নদী রক্ষাসহ এর সৌন্দর্য বিকাশে কাজ করে, তাহলে শুধু বর্ষা মৌসুমে নয়, বারোমাসই নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।

এই নদী বিশেষজ্ঞ আরও জানান, রংপুরে ২৮টি নদীর অস্তিত্ব বিদ্যমান। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এসব নদীরপাড়ে গিয়ে ছবি তুলেছেন। এ নদীগুলোর অতীত খুবই সমৃদ্ধ ছিল। এ নদীগুলোর পানি গিয়ে পড়েছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনায়। ব্রহ্মপুত্র যমুনায় মিলিত হওয়ার অর্থই হচ্ছে এ পানি চলে যায় সমুদ্রে।

রিভারাইন পিপলের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্র বলছে, তিস্তা নদী ভারতের সিকিম থেকে প্রবাহিত হয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা হয়ে গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিশেছে। এখন পর্যন্ত শুধু তিস্তা বেঁচে আছে, আগের মতো খরস্রোতা প্রবাহ নেই। রংপুর নগরের হাজিরহাট হয়ে মহাসড়ক ধরে সৈয়দপুরে যাওয়ার পথে প্রথমেই দেখা মিলবে ঘাঘট নদের। এ নদটি এসেছে নীলফামারীর তিস্তা থেকে। নীলফামারী থেকে তিস্তার পানি যেত ব্রহ্মপুত্রে। এখন তিস্তার মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় তিস্তা পানি বহন করতে পারে না। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে নদীর দুই ধারের সব অঞ্চলের পানি এ নদী বহন করে ভাটিতে ব্রহ্মপুত্রে নিয়ে যায়। এ নদীর তীরেই রংপুর ও গাইবান্ধা জেলা শহর।

২০০ বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদী বিশাল ছিল। এ নদীতে জাহাজ চলাচল করত। আর এখন নৌকাও ঠিকমতো চলে না। শুষ্ক মৌসুমে মৃত নদীতে পরিণত হয়। তারপরও এ নদীটির প্রস্থ ও গভীরতা দুটোই অনেক। কোথাও কোথাও অবশ্য নদীর তলদেশ অনেক ভরাট হয়েছে। পরিচর্যা পেলে এ নদীটি বারোমাসি নদীতে পরিণত হতে পারে।

বিড়ি শিল্পখ্যাত রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে মানাস নদী। তিস্তা নদীর অন্যতম প্রবাহ ছিল মানাস নদী ধরে। এই নদীর তীরে এক সময় হারাগাছ বন্দর গড়ে উঠেছিল। এ নদীতেও জাহাজ চলত। হারাগাছ বন্দরে ব্রিটিশরা জাহাজে করে আসতো। তারাই বাংলাদেশে প্রথম তামাকের চাষ শুরু করে হারাগাছ এলাকায়। সেই মানাস নদী এখন মৃত প্রায়।

অন্যদিকে রংপুর শহরের অদূরে উত্তর দিক ঘেঁষে প্রবাহিত বুড়াইল নামে দুটি আলাদা নদী আছে। এ নদীর সঙ্গে শহরের কেডি খাল। এর প্রস্থ ও গভীরতা অনেক কম। এ নদীর পাড়ে বুড়াইলের হাট নামক একটি বাজারও আছে। আরেকটি বুড়াইল নদী আছে কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের নব্দীগঞ্জ-মীরবাগ স্থানের মাঝামাঝি। সেখানে বুড়াইলের ব্রিজ নামে একটি সেতুও আছে। কৃষিকাজে সহায়ক এ দুটি নদীর জনজীবনে গুরুত্ব অনেক।

এছাড়া সোনামতি, মরা, আখিরা, কাঠগরি, ভেলুয়া, নলশীসা, নলেয়া, খটখটিয়া, টেপরির বিল, শাখা চিকলিসহ কয়েকটি নদী আকৃতিতে ছোট হলেও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ‘নতুন তিস্তা’ নদীটি ২০১৮ সালে নতুন করে তৈরি হয়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহিপুর সেতুর চার-পাঁচ কিলোমিটার উজানে বাঁধ ভেঙে নতুন প্রায় ১৫ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে আবারও তিস্তায় মিলিত হয়েছে। এই নতুন তিস্তা পুরাতন তিস্তার আন্তঃ শাখা নদী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতার সঙ্গে মিলে গেছে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার চিত্র। একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ১১২ মাইল দীর্ঘ এই নদী শুকিয়ে এখন মৃতপ্রায়। সামান্য বর্ষার ছোবলে ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করা করতোয়া নদীও এখন পানি শূন্যতায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কোথাও নেই আগের সেই প্রবাহ। নেই ডিঙ্গি নৌকা। ক্ষীণ এ নদীর প্রবাহ গাইবান্ধা ও বগুড়ায় প্রবেশ করে কিছুটা গতি পাওয়ার চেষ্টা করলেও তা এখন শুধুই ইতিহাস।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রংপুরের নদ-নদীগুলো এ অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ভূমির গঠন সব কিছুর ওপর প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। মানুষের সংস্কৃতি-অর্থনীতিতেও এগুলোর প্রভাব অনস্বীকার্য। কালের বিবর্তনে নদীগুলোর অবস্থা করুণ হয়েছে। এসব নদ-নদী রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি আমাদেরকে যথেষ্ট সজাগ ও সচেতন হতে হবে।

কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের (কাকসু) সাবেক ভিপি আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, আমরা পত্রপত্রিকায় দেখছি বিভিন্ন নদ-নদী দখল, দূষণ, বালু উত্তোলনের কবলে পড়ছে। অনেক সময় সচেতন মানুষজন নদী রক্ষায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ না হওয়াতে নদী দখল বন্ধ হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় নাম থাকলেও নদীর অস্তিত্ব থাকবে না।

গত আট বছর থেকে নদী রক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে রিভারাইন পিপল নামের একটি সংগঠন। প্রতি বছর নদীকৃত্য দিবসে বিভিন্ন নদ-নদীর পাড়ে গিয়েও মানববন্ধন সমাবেশ করছে তারা।

এই সংগঠনটির পরিচালক ও নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এসব নদী পুনরুদ্ধার করতে হলে অবৈধ বাঁধ অপসারণ, নদীর তলদেশ খনন ও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উৎস মুখ উন্মোচন করে কৃত্রিম ক্যানেলের মাধ্যমে ছোট নদীগুলোর সঙ্গে বড় নদীর সংযোগ সাধন করা গেলে কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের নদীগুলো আবার যৌবনে ফিরবে। ফের দেখা মিলবে খরস্রোতায় নদীপারের মানুষের ভাঙাগড়ার খেলা। তবে ভারত থেকে পানি প্রদানের আশ্বাসে বসে থাকলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেই থাকব। কারণ এমন প্রতিশ্রুতি তো আমরা একাধিকবার শুনেছি, বাস্তবে কিছুই পাইনি। আমাদের সরকারকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কথা ভেবে নদ-নদী রক্ষায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *