চট্টগ্রামের ষোলশহরের মেয়র গলি। এরপর চশমা খালের ব্রিজ ফেলে এগিয়ে যেতেই সামনে পড়ে ‘আর অ্যান্ড টি ইউনুস গার্ডেন’। ১০ তলা এই ভবনের ছয় তলায় থাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চাকরিচ্যুত উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনের পরিবার।
কলিংবেলে চাপ দিতেই দরজা খুললেন ফিরোজা আক্তার, শরীফের মা। পাশে দাঁড়ানো সাদিয়া চৌধুরী, শরীফ উদ্দিনের স্ত্রী। ভনিতা না করে সরাসরিই জিজ্ঞেস করলাম, বিয়ের পর কী কী সম্পদ হয়েছে আপনাদের?
‘আমার কিংবা আমাদের পরিবারের কারও নামে কখনও কোনো গাড়ি ছিল না। এখনও নেই। আমাদের নিজের নামে কোনো বাড়ি নেই। ব্যাংকেও অঢেল টাকা নেই। আমি এখন যে বাসায় আছি সেটিও আমার শ্বশুরের পেনশনের টাকা দিয়ে কেনা,’ একটানা বলে গেলেন সাদিয়া।
দুদকে শরীফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার সম্পদ থাকার অভিযোগ জমা পড়েছে। পটুয়াখালীতে কর্মরত অবস্থায় এমন অভিযোগ দিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। যিনি অভিযোগ দিয়েছেন তিনি একটি মোবাইল নম্বরও দিয়েছিলেন সঙ্গে।
তবে সেই নম্বরটি ছিল ভুল, ১০ সংখ্যার। সেই অভিযোগের সূত্র ধরে শরীফের সম্পত্তির খোঁজ করেছে জাতীয় দৈনিক সমকাল। পর্যালোচনা করে দেখেছে শরীফের সর্বশেষ আয়কর নথিও।
শরীফের মা ফিরোজা আক্তার সমকালকে বললেন,’শরীফের বাবা মারা গেছেন ২০২০ সালে। ওনার মৃত্যুর পর প্রায় ৫০ লাখ টাকা পেনশনসহ বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ পেয়েছি আমরা। সেখান থেকে ৩২ লাখ টাকা দিয়ে গত বছর পুরোনো এই ফ্ল্যাটটি কিনেছি। এক হাজার ৪৩০ বর্গফুটের এই ফ্ল্যাটের মালিক আমার চার ছেলে ও এক মেয়ে। এর বাইরে আমাদের কোথাও কিছু নেই।’
ঘরে বসেই ফোনে কথা হয় শরীফ উদ্দিনের সঙ্গেও। তিনি বলেন, ‘শতকোটি টাকার সম্পদ তো দূরের কথা, কেউ কোটি টাকার সম্পদও দেখাতে পারবে না আমার। সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় ১২ বছর চাকরি করেছি আমি। দুদকে যোগদানের আগে ভেটেরিনারি চিকিৎসক ছিলাম। আমার কোনো বাড়ি-গাড়ি নেই। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি হিসাবে আমার বেতন জমা হয়। সেখানে বাবার পেনশনের কিছু টাকাও আছে।’
সর্বশেষ আয়কর নথি অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সম্পদ শরীফের। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার কিছু সম্পদ আছে চাঁদপুরে। প্রায় তিন একর জায়গা পেয়েছি আমরা চার ভাইবোন। সেগুলো এখনও বণ্টন হয়নি। রেলওয়েতে চাকরি করতেন বাবা। অবসরের পর তিনি যে টাকা পেয়েছেন তা দিয়ে ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছে। বাকি টাকা আমার অ্যাকাউন্টে রেখেছেন মা। আয়কর নথিতে এসবের প্রমাণ আছে। আমার নগদ টাকা দেখানো আছে সম্ভবত ২৫ লাখ টাকা।’
শরীফ উদ্দিনদের বাসার বসার ঘরের এক পাশে প্লাস্টিকের একটি মোড়া। আরেক পাশে একটি কাঠের চেয়ার। পুরোনো সোফার পাশে বই রাখার আলমারি। তার সামনে রাখা অনেক দৈনিক পত্রিকা। তাতে প্রধান শিরোনামে শরীফ উদ্দিন। সেটি দেখিয়ে মা ফিরোজা আক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম- আপনি কি মনে করেন আপনার সন্তান সৎ?
ফিরোজা বেগম বললেন, ‘ও খুব একরোখা। তবে সততায় সবার সেরা। কোনো দুর্নীতিতে কখনও জড়াতে দেখিনি তাকে। তার বাবাও ছিলেন সততায় অটল। রেলওয়ের বাসা পেতে অনেকে তদবির করতেন। আমার স্বামী কখনোই তদবির করে বাসা নেননি। এই চট্টগ্রামেই ভাড়া বাসায় ছিলাম আমরা ৩০ বছর।’
ফিরোজা বেগম যখন এসব বলছিলেন তখন নীরবে অশ্রু ঝরছিল সাদিয়া চৌধুরীর। ঘড়ির কাঁটায় তখন ৩টা বাজে। টেবিলে দুপুরের খাবার রাখা ছিল। কিন্তু শরীফের মা ও স্ত্রী কেউ মুখে নিচ্ছিলেন না খাবার।
সাদিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিয়ে করেছি। প্রায় ছয় বছর সংসার করছি। কোনোদিন সম্পদ নিয়ে উচ্চাশা দেখিনি তার। সততায় অটল ছিল বলে আমাদের বাসার নিচে সাদা কাগজ রেখে তাতে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। লিখেছিল, আমাদের দুই সন্তান। তাদের ভবিষ্যৎ আছে। কেন এত বাড়াবাড়ি করি? এসব দেখেও ভয়ে দমে যায়নি শরীফ। সে বলত ঝুঁকি নিয়েই ভালো কাজ করতে হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধেও আমরা বিজয়ী হয়েছি ঝুঁকি নিয়ে।’
শরীফের পাঁচ বছর চার মাস বয়সী একটি মেয়ে আছে। ঘুমাচ্ছিল। জেগেছিল তার দুই বছর তিন মাস বয়সী পুত্র সন্তানটি। মায়ের পাশে এক স্বজনের কোলে বসে ছিল।
শরীফের স্ত্রী বলেন, ‘আমার কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। এই ছেলে সন্তানের জন্য ইসলামী ব্যাংকে একটি ডিপিএস করা আছে। মাসে চার হাজার টাকা জমা দিতে হয়। এখন সম্ভবত তিন লাখ টাকা জমেছে আমাদের। কিন্তু গত কয়েক কিস্তির টাকা বকেয়া হয়ে গেছে। মেয়ের নামে প্রগতি ইন্সুরেন্সে একটি বীমা আছে। সেখানে মাসে ছয় হাজার টাকা জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু কিস্তি বাকি পড়েছে সেখানেও।’
বাবা-চাচাদের সম্পদ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাদিয়া চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামের মুরাদপুরে চৌধুরী টাওয়ার নামে আমার বাবা-চাচাদের একটি ভবন আছে। আমার বাবা কাস্টমস কর্মকর্তা ছিলেন। আমার চাচা প্রকৌশলী আবুল কালাম হচ্ছেন আব্দুল মোনায়েম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক। দাদার নামে থাকা জায়গার ওপর বাবা-চাচারা ভবন করেছেন আমার বিয়ের আগেই। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এ ভবন করে দিয়েছে। এটির তৃতীয় তলায় থাকে আমার ভাই। বিয়ের পরে আমাদের কোথাও কোনো ভবন হয়নি।’
দুদকে যারা চাকরি করেন তাদের চাকরিতে যোগদানের সময় সম্পদের হিসাব দিতে হয়। কেউ যদি পাঁচ লাখ টাকার অধিক টাকার সম্পদ কেনেন তাহলে অনুমতি নিতে হয় কমিশন থেকে।
শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘গত সাত বছরে আমি কোথাও এককভাবে সম্পদ করিনি। দুদকের ৩৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে সমিতি করে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ১০ কাঠার একটি জমি কিনেছি। সেখানে আমার ভাগে এসেছে ৬০ হাজার টাকা। আমি গত বছর এ টাকাটা পরিশোধ করেছি। আমার নিজের নামে কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের নামে ঘোষণার বাইরে কোনো সম্পদ থাকলে তা বাজেয়াপ্ত করা হোক।’
উল্লেখ্য, গত বুধবার দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর স্বাক্ষর করা এক প্রজ্ঞাপনে কমিশনের উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে অপসারণের আদেশে জারি হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০০৮- এর বিধি ৫৪ (২) তে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলো।
“তিনি বিধি মোতাবেক ৯০ দিনের বেতন এবং প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা (যদি থাকে) পাবেন। কমিশনের অনুমোদনক্রমে জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো। যা ১৬ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ন থেকে কার্যকর গণ্য হবে।”
পরের দিন বৃহস্পতিবার এই আদেশ প্রত্যাহার ও ৫৪(২) বিধি বাতিলের দাবিতে দুদক সচিবকে স্মারকলিপি দেন কমিশনের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি দুদকের প্রধান কার্যালয়সহ সংস্থাটির অন্যান্য দপ্তরে মানববন্ধন হয়।
পরে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে শরীফ উদ্দিনকে ‘শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে’ বিধি মোতাবেক চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে দাবি করেন দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন।
তিনি বলেন, “ওই কর্মকর্তার (শরীফ) বিরুদ্ধে ‘সুনির্দিষ্ট’ বহু অভিযোগ থাকায় তাকে অপসারণ করতে হয়েছে।”
এছাড়া শরীফের বিরুদ্ধে ‘শৃঙ্খলা বহির্ভূত’ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও দপ্তর থেকে আসা নানা অভিযোগও তুলে ধরেন দুদক সচিব।
তবে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছিল তাদের অভিযোগ আমলে নিয়ে সেসবের তদন্ত ছাড়াই তাকে অপসারণ করা হয়েছে বলে দাবি করে আসছেন শরীফ।
দুদকের চাকরিচ্যুত এই কর্মকর্তা দাবি করেন, “অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ‘আপস’ করলে এতকিছু ‘হত না’।”
