নজর২৪ ডেস্ক- গত রোববার থেকে হঠাৎ করেই পাওয়া যাচ্ছিল না অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুকে। খোঁজ না পেয়ে তার ছোট বোন ফাতেমাসহ পরিবারের সদস্যরা কলাবাগান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সোমবার দুপুরে কেরানীগঞ্জ থেকে শিমুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মরদেহটি প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবেই ধরা হচ্ছিল। পরে আঙুলের ছাপ ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে জানা যায় বস্তাবন্দি মরদেহটি শিমু।
নিখোঁজের আগে কী হয়েছিল তা সংবাদমাধ্যমকে জানালেন শিমুর বোন ফাতেমা। বললেন, ‘আমরা জানতে পারি রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে, ওর (শিমু) খুব কাছের একজন বন্ধু কল করে আমাকে জানায়, শিমুকে অনেকক্ষণ ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। সে আমার কাছে জানতে চায়, আমার সঙ্গে শিমুর কথা হয়েছে কি না। আমি বলি, না, আমার সঙ্গে কথা হয় নাই। মেসেঞ্জারে কল করেছিলাম, কিন্তু ধরেনি।
‘এরপর আমি আমার বোনের মেয়েকে, মানে শিমুর মেয়েকে কল দিলাম। সে বলল, আম্মু (শিমু) সকালে বের হয়েছে। আমি বললাম, সকালে বের হওয়ার পরে তোমাদের সঙ্গে কি আর কোনো কথা হয়েছে। সে বলে যে না, কথা হয় নাই।’
ফাতেমা জানান, এরপর থেকে শিমুর ফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।
তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে আমি, আমার ভাই, তার স্ত্রীকে নিয়ে বের হয়ে গেছি। অনেক জায়গায় ফোন করেছি, কারও সঙ্গেই কথা হয় নাই। ওর ক্লোজ একটা বান্ধবী আছে, যার নাম আনমন, ওনাকে কল দিলাম, বললাম বিষয়টা।’
আনমন ফাতেমাকে জানান, তিনি রোববার সকালে ১০টা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শিমুকে কল করেছিলেন। ফোন খোলাও পাওয়া গেছে, কিন্তু রিসিভ করেননি।
এর মধ্যে রাত ১১টার দিকে কলাবাগান থানায় চলে যান ফাতেমা। বোন শিমু নিখোঁজ জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল, মিটফোর্ড হাসপাতালে খবর নেন তারা। কিন্তু কোনো হদিস মেলেনি।
রোববার শেষ হয়ে সোমবার
শিমুর বোন ফাতেমা বলেন, ‘আমরা ভোর থেকেই আবার বোনকে খোঁজা শুরু করি। একসময় পুলিশের এসআই আমাদের জানান, শিমুর ফোন বন্ধ হয়েছে রোববার সকাল ১০টা ২৬ মিনিটে।’
ফাতেমার ধারণার সঙ্গে মিলে যায় ফোন বন্ধের হিসাবটা। তিনি জানান, রোববার শিমু বাসা থেকে বের হয়েছেন সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে। ফোনটাও অফ হয়েছে ওই টাইমে।
ফাতেমা বলেন, ‘পুলিশ শিমুর শেষ অবস্থান জানাতে পারেনি। এর মধ্যে আমি র্যাবে, ডিবি ও সন্ধ্যায় সিআইডিতে কথা বলি। সন্ধ্যায় আমাদের একজন ফোন করে বলেন লাশ পাওয়া গেছে।’
কোথায় যাচ্ছিলেন শিমু
ফাতেমা বলেন, ‘আমার বোনজামাই (শিমুর স্বামী নোবেল) যেটা বলল, রোববার সকালে তাকে শিমু ডাক দিয়ে বলেছে, তুমি ওঠো বাজারে যাব। বুয়া আসলে তুমি বলবা যে আধাঘণ্টা পরে আসতে। কিন্তু শিমু আর বাজারে যায়নি। কিছুক্ষণ পরে তার স্বামীকে বলে, আমি একটু মাওয়া যাব, দেরি হইতে পারে। এটা বলে বের হয়ে গেছে।’
কোনো দ্বন্দ্ব?
ফাতেমা জানান, তার সঙ্গে প্রতিদিনই কথা হতো শিমুর। কিন্তু তাদের পরিবারে কোনো দ্বন্দ্ব-কলহ আছে কি না সে ব্যাপারে কখনও কথা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমাকে এভাবে কিছু বলে নাই যে কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব আছে কি না। সে তো মিডিয়াকর্মী। আমার সঙ্গে প্রতিদিনই কথা হতো, কিন্তু থাকে না যে হার্ড দ্বন্দ্ব এ রকম কোনো কিছু কখনও বলেনি।
‘কাজের ক্ষেত্রে অনেকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। সেটা অন্য ইস্যু, ওদের এফডিসিতে যেটা চলে, সেটা অন্যরকম। কিন্তু আমার বোনকে মার্ডার করে ফেলতে পারে, এ রকম কোনো দ্বন্দ্বের কথা আমার জানা নাই।’
পুলিশ যা বলছে
ঘটনার রাতেই শিমুর স্বামী খন্দকার শাখাওয়াত আলীম নোবেল ও তার বাল্যবন্ধু এসএমওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদকে আটক করে পুলিশ। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাহিনীটি জানতে পেরেছে, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের কারণে জীবন দিতে হয়েছে শিমুকে।
আর এই হ ত্যার কথা স্বীকার করেছেন নোবেল। বন্ধুকে নিয়ে মরদেহটি গুম করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
এ বিষয়ে ব্রিফিংয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে যে গাড়ি ব্যবহার করে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়েছে সেই গাড়িটি জব্দ করে থানায় নিয়েছি এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করেছি।’
নোবেল এবং তার বাল্যবন্ধু ফরহাদ বর্তমানে থানা হেফাজতে আছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চাঞ্চল্যকর এই হ ত্যা মামলার মূল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে । এ ঘটনায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি হ ত্যা মামলা রুজু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
জানা যায়, আজ থেকে ঠিক দুই যুগ আগে ১৯৯৮ সালে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে বরিশালের মেয়ে রাইমা ইসলাম শিমুর। তার প্রথম সিনেমা কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘বর্তমান’। যেখানে তিনি অভিনয় করেন তখনকার জনপ্রিয় তারকা মান্না, মৌসুমী, ডিপজল প্রমুখের সঙ্গে।
এরপর ছয় বছরে একে একে অভিনয় করেছেন ২৩টিরও বেশি সিনেমায়। তবে সবশেষ তাকে দেখা গেছে ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জামাই শ্বশুর’ সিনেমায়। ফলে এই সময়ের দর্শকদের কাছে তিনি ততটা পরিচিত নন।
তবে গত কয়েক বছর ধরে শিমু নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিনয় করেছেন প্রায় ৫০টি নাটকে। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত নাটক ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’-এও অভিনয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। তার নিজের প্রোডাকশন হাউজ ছিল। মাঝে মধ্যে পরিচালনাও করতেন এই নায়িকা।
রহস্যজনকভাবে খুনের শিকার হওয়া এই নায়িকা বাংলাদেশের অনেক গুণী পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন-প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলাম, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, দেওয়ান নজরুল, এ জে রানা, শরিফুদ্দিন খান দ্বীপু, ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম, স্বপন চৌধুরী, এনায়েত করিম, শবনম পারভীন।
তিনি অভিনয় করেছেন রিয়াজ, অমিত হাসান, বাপ্পারাজ, জাহিদ হাসান, মোশারফ করিম, শাকিব খানসহ অনেক গুণী ও জনপ্রিয় অভিনেতাদের বিপরীতে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি থেকে বাদ পড়া ১৮৪ জন সদস্যদের একজন ছিলেন শিমু। ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে তিনি ছিলেন বেশ সক্রিয়। স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে শিমু রাজধানীর গ্রিনরোড এলাকার বাসায় থাকতেন।
