নজর২৪ ডেস্ক- অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদ দিনে দিনে বাড়ছে। ফাঁদে পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। প্রতারিত হওয়া প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সুরাহা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। আত্মসাৎকারী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ আনছেন গ্রাহকরা। প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে কেউ কেউ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও মামলা করছেন।
এসব মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড। এছাড়া আদালত আসামিদের অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডেও দণ্ডিত করতে পারেন। তবে গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকা কিভাবে ফেরত পেতে পারেন তা নিয়ে আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন আইনজীবীরা।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকলেও আইনে আসামিদের কাছ থেকে গ্রাহকদের টাকা ফেরতের সুযোগ নেই। তবে আসামি যদি মীমাংসা করেন, কেবল তখনই টাকা ফেরত পেতে পারেন ভুক্তভোগীরা।
আইনবিদরা মনে করছেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অংকের অর্থ ফেরত পেতে হলে গ্রাহকদের দেওয়ানী মামলা করতে হবে।
অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে লোভনীয় অফারে গ্রাহকের কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকম ও রিংআইডি মতো বেশকিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিরুদ্ধে গ্রাহকরা মামলা করলে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ও গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) তাপস কুমার পাল বলেন, অধিকাংশ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্ণধারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি আইনের ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ধারাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড। আদালত চাইলে অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড দিতে পারেন। আইনানুযায়ী এ মামলাগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। কেবল দুপক্ষের আপস মীমাংসার মাধ্যমেই গ্রাহকেরা টাকা ফেরত পেতে পারেন।
আইনজীবী জি এম মিজানুর রহমান বলেন, দণ্ডবিধি আইনের মামলা করে ই-কমার্সের ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা টাকা ফেরত পাবেন না। এজন্য তাদের যেতে হবে দেওয়ানী আদালতে। সেখানে মামলা করলে তবেই টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি প্রতারিত হন, তিনি ফৌজদারি আইনের পাশাপাশি দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী টাকা আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে মানি মোকদ্দমা করতে পারেন। বাদী যদি তাঁর দাবি আদালতে প্রমাণ করতে সক্ষম হন, তাহলে আদালত বাদীর পক্ষে ডিক্রি দেন।’
অবশ্য অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন মনে করেন, মানি মোকদ্দমা নিষ্পত্তি একটা লম্বা আইনি প্রক্রিয়া। বাদী মামলা করলে বিবাদীপক্ষ সব সময় তৎপর থাকেন, কীভাবে মামলা ঝুলিয়ে রাখা যায়। তবে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ‘মানি মোকদ্দমা’ই একমাত্র আইনি সমাধান।
সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক টাকা আদায়ের জন্য কোম্পানি কিংবা অন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে পারেন। এটি কার্যকর আইনি পদক্ষেপ।
এর আগেও যুবক, ডেসটিনি কিংবা ইউনিপেটুইউর মতো প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় ফাঁদে আটকা পড়ে হাজার হাজার গ্রাহক টাকা খুইয়েছেন, কিন্তু কেউই তাঁদের টাকা ফেরত পাননি। বেশি লাভের আশায় টাকা বিনিয়োগ করে পথে বসে গেছেন অনেক গ্রাহক।
এসব ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষ এবং ব্যক্তির পক্ষ থেকেও ফৌজদারি মামলা হয়েছে। সেসব মামলার বেশির ভাগ বিচারাধীন। অবশ্য ইউনিপেটুইউর ২৫৫ জন গ্রাহক টাকা আদায়ের জন্য ইউনিপেটুইউর চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামানসহ ১৫ জনকে বিবাদী করে ২০১৮ সালে ঢাকায় দেওয়ানি আদালতে ‘মানি মোকদ্দমা’ করেন। এই মামলার বিচার চলমান।
বর্তমানে ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালিসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কম দামে পণ্য বিক্রির লোভনীয় ফাঁদে যাঁরা আটকে গেছেন, সেসব গ্রাহকের কথা চিন্তা করে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শফিক আহমেদ বলেন, গ্রাহকেরা প্রতারিত হয়ে টাকা না পাওয়াটা দুঃখজনক। সরকারের উচিত, যেসব কোম্পানি গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি গ্রাহকের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া উচিত রাষ্ট্রের। যাকে মানুষ টাকা দিল, তার যদি সম্পত্তি থাকে, সেটা ক্রোক করে বিক্রি করে যতটুকু সম্ভব গ্রাহককে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
ভোক্তা অধিকার সূত্র জানায়, চলতি বছরের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ইভ্যালি’র বিরুদ্ধে। গত জুন পর্যন্ত চার হাজার ৯৩২টি অভিযোগ পড়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। গত জুলাইয়ে আরও পাঁচ শতাধিক অভিযোগ আসে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজারে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় অফারে পড়ে অনেকে কম দামে পণ্য কিনে সেগুলো আবার বাজারে বিক্রির মাধ্যমে বেশি মুনাফা করতে চেয়েছেন। তাদের অনেকেই এখন অভিযোগের স্তুপ নিয়ে আসছেন। যা নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। কিন্তু এসব গ্রাহক যখন পণ্য ক্রয় করেছিলেন তখন একটিবারের জন্যেও ওই কোম্পানিটির পণ্য ক্রয়ের শর্তগুলো পড়েননি। সেদিক বিবেচনায় নিলে দেখা যায় এটা স্বেচ্ছায় টাকা জলে ঢালার মতো। তারপরও ভোক্তা অধিকার গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের উদ্যোগ নেবে।’
