মুক্তমত ডেস্ক- যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন। বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) লন্ডন সময় বিকেল ৫টায় তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকেলে তাঁকে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
এদিকে কয়েকদিন চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেই আবার কলাম লেখা শুরু করেছেন গাফ্ফার চৌধুরী। আর প্রথম কলামই লিখলেন পরীমণি, মুনিয়া ও দেশের গণমাধ্যমসহ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে। জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় আজ রোববার (০৩ অক্টোবর) কলামটি প্রকাশিত হয়েছে।
সেখানে তিনি বলেন, দেশে এখন শক্তি কেন্দ্র অনেকগুলো। বিএনপি বলছে, দেশে ক্ষমতা এখন এককেন্দ্রিক। সব ক্ষমতা শেখ হাসিনার কাছে। কথাটা সত্য নয়। মিলিটারি শাসনের আমলে ক্ষমতা ছিল মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির হাতে। বিএনপির আমলে তারেক রহমান সদ্য ধনীদের একটা অংশকে নিয়ে প্রধান শক্তিকেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিল হাওয়া ভবনে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ভাগ নিয়ে মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির সঙ্গে তারেক রহমানের বিবাদ হয়। এই মিলিটারিরাই তাকে দুর্নীতির দায়ে জেলে নিয়ে পিটিয়ে ঠ্যাং ভেঙে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। তার ফায়দা পাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। খালেদা জিয়ার পতনের কারণও তারেক-মিলিটারি বিবাদ।
আওয়ামী লীগ সরকার জিয়ানোমিকস বা জিয়ার পুঁজিবাদী অর্থনীতি গ্রহণ করায় দেশে পুঁজিবাদ শক্তিশালী ও বিভাজিত হয়েছে। এখন দেশ শাসনের ক্ষমতা শেখ হাসিনার একক হাতে নয়। সিভিল ও মিলিটারি দেশ চালায়। শেখ হাসিনা এক গাদা মন্ত্রী নিয়ে সরকার চালান। দিন দিন এই সরকারের ক্ষমতা কমছে। কিছু ক্ষমতা নিয়ে গেছে বড় বড় এনজিও। এগুলো পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই পুঁজিপতিদের এখন নানা গ্রুপ। নিজেদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যবহারের জন্য এই বড় গ্রুপগুলো প্রত্যেকেই মিডিয়া শক্তির দুর্গ গড়ে তুলেছে। এই দুর্গে দুর্গে যখন যুদ্ধ হয় তখন অনেক উলুখড়ের প্রাণ যায়। ভারতেও তা গেছে। বিড়লা ও ডালমিয়া গ্রুপের দ্বন্দ্বে ডালমিয়া জেলে গেছেন। তার সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই যুদ্ধে নেহেরু সরকার বিড়লা শিল্পপতি গোষ্ঠীর সেকেন্ড পার্টনারের ভূমিকা নিয়ে ছিল। এই বিবাদেও মুম্বাইয়ের বলিউডের সুন্দরী দুই তারকাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এক তারকা আ.ত্মহ.ত্যা করেন।
বাংলাদেশে মুনিয়ার তথা কথিত আ.ত্মহ.ত্যা থেকে পরীমণির কেলেঙ্কারি সবই লন্ডন ও মুম্বাইয়ের শিল্পগোষ্ঠীদের দ্বন্দ্বে সুন্দরী নারী বলি দেওয়ার মতো। অতীতে সুন্দরী হেলেনা যেমন ট্রয়ের যুদ্ধে ব্যবহৃত সাম্প্রতিক বাংলাদেশে মুনিয়া-পরীমণিও এক অসৎ ট্রেডওয়ালের হাতে নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহূত। মুনিয়াকে আ.ত্মহ.ত্যা করতে হয়েছে। পরীমণিকেও আ.ত্মহ.ত্যা করতে হতো অথবা আ.ত্মহ.ত্যা করতে বাধ্য করা হতো। সে বেঁচে গেছে। তাৎক্ষণিক বুদ্ধি ও অভূত সাহসিকতার জন্য। তাকে যেভাবে পরিচয় না জানিয়ে ডাকাত ধরার মতো বিভীষিকাপূর্ণ পরিবেশে ঠেলে নেওয়া হয়েছিল, তখন মাথা ঠান্ডা রেখে ফেসবুক ওপেন রেখে সাহায্য প্রার্থনা করে সে বেঁচে গেছে।
তারপরও তাকে রেহাই দেওয়া হয়নি। একশ্রেণির মিডিয়া গ্রুপ খাড়া রাখা হয়েছিল তার চরিত্র হরণের জন্য। আমি তার রূপমাধুর্য্যে নয়, তার চরিত্রের শক্তিমাধুর্য্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে সমর্থন দানে এগিয়ে গেছি। এগিয়ে এসেছেন শক্তিমান মানবতাবাদী আইনজীবী অ্যাডভোকেট পান্না খান। দেশের সত্ বুদ্ধিজীবীরাও তাকে সমর্থন দানে এগিয়ে আসেন। তারা জানতেন পরীমনির পরাজয় তাদেরও পরাজয়।
মাত্র কিছুকাল আগে নির্বাচনি দ্বন্দ্বে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে পূর্ণিমা শীল। ক্ষমতা গ্রুপের শক্তির দ্বন্দ্বে প্রাণ দিতে হয়েছে মুনিয়াকে। তারপর পরীমনিকে ফাঁসানো হয়েছে বোট ক্লাবের কেলেঙ্কারিতে। একশ্রেণির বড় মিডিয়া এখানে নারীদের ওপর সব দোষ চাপাতে সদা প্রস্তুত। মুনিয়া মরেছে কেন? না কেউ তাকে মারেনি। সে ছিল উচ্ছৃঙ্খল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ায় সে আত্মহত্যা করেছে। অনুরূপভাবে পরীমনিও এক অসংযত চরিত্রের তরুণী। গভীর রাতে ক্লাবে গিয়ে মদ খেয়ে ভাঙচুর করে। সে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ে জড়িত। সে রাতের রানি ইত্যাদি ইত্যাদি। তাকে সিটি ব্যাংকের ম্যানেজার ৩ কোটি টাকার মোটরগাড়িও উপহার দিয়েছে আরো কত কি?
ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুললেন পরীমণি
এভাবে প্রচার চালিয়ে পরিমনিকেও আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা যেত। তা তাহলে বিভাজিত অসত্ ও উঠতি পুঁজিপতি প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বা একাধিক গ্রুপের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নারীদের অসংযত জীবনকে দায়ি দেখিয়ে মুনিয়া ও পরিমণি দুজনকে চিরকালের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখা যেত। এই ব্যাপারে আওয়ামীপন্থি ও বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের মধ্যে একটা অপ্রকাশ্য বোঝাপড়া রয়েছে। একে অন্যের নারীঘটিত গোমর ফাঁস করবেন না। এক্ষেত্রেই ভুলটা করে ফেলেছেন এক শিল্পপতি গোষ্ঠীর মিডিয়ার সম্পাদক। তিনি একটা মৃত্যু নিয়ে খবর একটু খোলামেলা ছাপতে গিয়ে দুই শিবিরের অপ্রকাশ্য বোঝাপড়া ভেঙে ফেলেন। অন্যপক্ষ দুশ্চিন্ত। সম্পাদক পরিষদে এবং স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিক সমাজে ভাঙন ধরে। দেশে এখন উঠতি পুঁজিপতিরা শক্তিশালী।
যদিও তাদের অবস্থা পচনশীল। রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এমন কিছু নেই যেখানে হাইব্রিড হয়ে তারা ঢোকেনি। মিডিয়াতেও এখন দেশে হাইব্রিড সম্পাদক কি নেই? তারা কি সাংবাদিক সমাজের নেতৃত্বে অনুপ্রবেশ করেননি? অনুপ্রবেশ করে প্রকৃত সাংবাদিকদের চরিত্রে কালি লেপতে চাননি? দেশের সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ তাদের সাম্প্রতিক বহু কাজের ব্যর্থতার দুর্বলতা ঢাকতে সম্পাদকদের মধ্যে বিভাজনকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। এটা আমার ধারণা। হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রী। মৌচাকে ছোট্ট একটা ঢিল মেরে দেখলেন নিজেদের শক্তি কতটা?
অমনি সব মৌমাছি এক হয়ে গেল। সব ভুজঙ্গরাও। নইলে ধোপা সাফ না হলে কাপড় কেয়া করে গা? স্বাস্থ্য বিভাগ এক মহিলা সাংবাদিকের গায়ে অবৈধভাবে হাত দিয়ে দেখেছেন, পারেননি। ইনি গরিব যমুনা দাস নন। যে ইচ্ছে হলেই পুলিশ তাকে বিনা দোষে জেলে ঢুকিয়ে রাখতে পারে। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট জামিন না দিয়ে ঘোরাতে পারে। পরীমনির বেলায়ও পুলিশের কর্তার ইঙ্গিতে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এটা করতে চেয়েছিল। হাইকোর্টের দাবড়ানিতে তা পারেননি।
বাংলাদেশে উঠতি পুঁজিপতির লড়াইয়ে পরীমণিরা বলি হচ্ছে কেন?
সাংবাদিকেরা সবাই (হাইব্রিড ছাড়া) অসাধু নন। তারা তো প্রতি মাসেই ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিয়মিত দেন। অসাধুরা হয়তো দেন না। তাদের হিসাব স্বচ্ছ থাকলে তা দেখাতে আপত্তি কি? কিন্তু এটা শক্তির দ্বন্দ্ব। এখানে হারলে চলবে কেন? মিডিয়া তাই এক হয়ে গর্জে উঠেছে। নির্বাহী বিভাগ নির্বাক। মিডিয়ার শক্তির কাছে চুপসে গেছে। মন্ত্রীরা ক্ষমতায় না থেকেও ক্ষমতা দেখাতে গিয়েছিলেন। প্রমাণ করে দেওয়া হলো—They are in office, not in power. এটা ব্রিটেনের মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডক বারবার প্রমাণ করেছেন ব্রিটিশ রাজনীতিতে।
পুঁজিবাদীদের মধ্যেই ক্ষমতার বিভাজন হয়। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হয়। কেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ কি দুটি বড় পুঁজিবাদী দেশের মধ্যে শুরু হয়নি? বিলাতে এককালে টাইমস গ্রুপ অব মিডিয়া আর অবজারভার গ্রুপ অব মিডিয়ার যুদ্ধ কি ব্রিটিশ ক্যাপিটালিজমের বড় শরিক ও ছোট শরিকের দ্বন্দ্ব নয়? আবার সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ক্যাপিটালিস্টদের গ্রুপগুলো এক হয়ে গেছে। তবে ব্রিটেনে নির্বাচিত সরকারও স্ট্রং। জনমত অনেক সময় তাদের নিরাপত্তা দেয়। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের পেছনেও জনমত নড়বড়ে। এই সরকারকে ম্যানুভারিংয়ের ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। তাতে আমলাদের প্রতাপ বাড়ে। পুলিশের বড়কর্তা নৈশ ক্লাবের কর্তা হয়ে সুন্দরী ললনা নিয়ে খেলাধুলা করতে পারেন।
বাংলাদেশে পচনশীল পুঁজিবাবাদের শক্তির উত্তাপ কোথায় পৌঁছেছে মুনিয়া, পরীমণি কাহিনী তার উপসর্গ মাত্র। মিডিয়া লড়াই এই পুঁজিবাদী দ্বন্দ্বের গ্রুপভিত্তিক বহিঃপ্রকাশ। থেমে গেছে। আবার দেখা দেবে। আরো পরীমণির আবির্ভাব হবে সমাজে। মিডিয়া লড়াইও হবে। সৎ সাংবাদিকেরা সাবধান। থাকতে কি চাও নির্বিরোধ রক্তেই হবে সে ঋণ শোধ।
লেখক- গাফ্ফার চৌধুরী, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।।
