বিমানেই নিথর হয়ে পড়েন পাইলট নওশাদ, জরুরি অবতরণ করেন মোস্তাকিম

নজর২৪ ডেস্ক- ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে ১২৪ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার পথে আসছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি। ভারতের রায়পুরের আকাশে থাকাকালে হুট করেই নিথর হয়ে পড়েন ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। তখনই ককপিটের কন্ট্রোল নেন সঙ্গে থাকা ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম। ঘোষণা করেন মেডিক্যাল ইমার্জেন্সে। ক্যাপ্টেন নওশাদ অসুস্থ হওয়ার ২৫ মিনিটের মধ্যে নাগপুরের ড. বাবা সাহেব আম্বেদকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করেন উড়োজাহাজটি।

 

গত ২৭ আগস্ট বিজি ০২২ ফ্লাইটে থাকা এক ক্রু’র বর্ণনায় উঠে এসেছে সেদিনের ঘটনা। সেই ফ্লাইটে ১২৪ জন যাত্রী ছাড়াও দু’জন ককপিট ক্রু ও ছয় জন কেবিন ক্রু ছিলেন।

 

সেই ফ্লাইটে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কেবিন ক্রু গণমাধ্যমকে বলেন, হুট করেই ককপিট থেকে ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম জানালেন ক্যাপ্টেন নওশাদ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ককপিটে গিয়ে আমরা তার অবস্থা দেখে বুঝতে পারি- তিনি মারাত্মকভাবে হার্ট অ্যাটাক করেছেন। তার নিজের যে খারাপ লাগছে কিংবা অসুস্থ বোধ করছেন- এ কথা বলারও সুযোগ পাননি। তিনি পুরোই কলাপ্স করেছেন। অথচ আমরা ফ্লাইট শুরুর পর তাকে খাবার দিয়েছিলাম, তিনি সেই খাবার খেয়েছেনও।

 

সেদিনের কঠিন সেই মুহূর্ত বর্ণনা করে এই কেবিন ক্রু বলেন, ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম মেডিক্যালে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে দ্রুত জরুরি অবতরণের জন্য কন্ট্রোল টাওয়ারে যোগাযোগ শুরু করেন। আর আমরা কেবিন ক্রুরা মেডিক্যাল ইমার্জেন্সের এসওপি অনুযায়ী কেবিনে কোনও চিকিৎসক আছে কি না জানতে চাই। কারণ উড়োজাহাজে থাকা মেডিক্যাল বক্স চিকিৎসকদের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত ফ্লাইটে কোনও ডাক্তার না থাকায় আমরা নিজেরাই সেগুলো ব্যবহার করে ক্যাপ্টেন নওশাদকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে থাকি।

 

ঘটনার পর ২০-২৫ মিনিটে মতো শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করতে হয়েছে উল্লেখ করে সেই কেবিন ক্রু বলেন, ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম কলকাতা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। এটিসি থেকে নাগপুর এয়ারপোর্টে অবতরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আমার ফার্স্ট অফিসারকে সাহস যোগানোর চেষ্টা করেছি, তিনিও দৃঢ়ভাবেই ফ্লাইট অপারেট করেছেন। ফ্লাইটটি নাগপুরে অবতরণ জন্য আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। পরিস্থিতি যাত্রীদের জানানো হয়েছিল। তারাও ভালোভাবেই আমাদের সহযোগিতা করেছেন। আগে থেকেই বিমানবন্দরে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত ছিল। রানওয়েতে নামামাত্র দ্রুত ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইউমকে উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে অ্যাম্বুলেন্স করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

 

এদিকে সেই ফ্লাইটের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ওমানপ্রবাসী বাংলাদেশি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার আরিফুল ইসলামও। তিনি সেই ফ্লাইটে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করছিলেন। ককপিটের খুব কাছাকাছি থেকে বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করেছেন আরিফুল।

 

ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, যখন কেবিন ক্রুরা চিকিৎসকের খোঁজ করছিলেন তখনই বুঝতে পেরেছিলাম ফ্লাইটে কেউ অসুস্থ হয়েছে। তবে ক্যাপ্টেন যে নিজেই হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন, সেটি বুঝতে পারিনি। পাইলট বা কেবিন ক্রুরাও তা বুঝতে দেয়নি।

 

পুরো ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা নিয়ে আরিফুল বলেন, ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ২টা ৩০ মিনিটে (ওমানের স্থানীয় সময়) ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। পরে এটি ডিলে (সময় পরিবর্তন) হয়ে সাড়ে ৪টায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। আমরা সাড়ে ৪টায় বিমানে উঠে যাই। তবে প্লেন ছাড়েনি। আমাদের প্লেনের ভেতরে রেখে বলা হলো, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফ্লাইট আরও ২ ঘণ্টা বিলম্বে রওনা হবে।

 

‘এরপর সাড়ে ৬টার দিকে প্লেন ছাড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা ফ্লাইটটি আকাশে উড়ে। আকাশটা স্বচ্ছ ছিল। প্লেনটাও স্বাভাবিকভাবেই উড়ছিল। হঠাৎ ককপিট থেকে জানতে চাওয়া হয়, আমাদের মধ্যে কোনো ডাক্তার আছে কি না? কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা করতে পারি কি না, কারও নার্সিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে কি না ইত্যাদি। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, আমাদের মধ্যে কোনো যাত্রী হয়ত অসুস্থ।’

 

প্লেনের সামনের সারিতে বিজনেস ক্লাসের একটি নম্বর সিটে ছিলেন আরিফুল। ওই ক্লাসে তিনি ছাড়া আরেকজন নারী যাত্রী ছিলেন। বাকি সিটগুলো খালি ছিল। সেখানে বসেই হঠাৎ শুনলেন কেবিন ক্রুর ঘোষণা, ফ্লাইটটি ভারতের নাগপুর বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করবে।

 

আরিফুল বলেন, এ ঘোষণা শুনে আমরা পেছনে ও আশপাশে দেখি, তবে কোনো রোগী দেখতে পাইনি। কেবিন ক্রুর ঘোষণার ১৫-২০ মিনিটের মাথায় ফ্লাইটটি অবতরণ করে। অবতরণের পর যখন প্লেনটি থামল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি অ্যাম্বুলেন্স প্লেনের দরজার সামনে চলে আসে। হঠাৎ দেখি পাইলট স্যারকে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে কয়েকজন তুলে নিয়ে গেছে। একজন কেবিন ক্রু অক্সিজেন সিলিন্ডার ধরে ছিল। মুহূর্তেই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ফ্লাইটের ফার্স্ট অফিসার ও কেবিন ক্রু’রা অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার ছিল। তাদের কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখালেও তারা কখনও আমাদের পাইলটের অসুস্থতার বিষয়টি বুঝতে দেননি। বুঝলে হয়ত আকাশেই অনেকে ভয় পেত।

 

পাইলটকে নিয়ে যাওয়ার পরের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, পাইলটকে নিয়ে যাওয়ার পর ভারতের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন ফ্লাইটে ঢুকে আমাদের তল্লাশি করে। প্লেনের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালায়। এরপর আমাদের প্লেন থেকে নেমে বিমানবন্দরে যেতে বলে। তবে যাত্রীরা বিমানবন্দরে যেতে রাজি হচ্ছিল না। কেউ কেউ নেমে গেলেও অনেকেই জেদ করে বসে ছিলেন। পরে অবশ্য তারাও নামেন। রাতে আমাদের নতুন বিমানে করে ঢাকায় আনা হয়।

 

এদিকে পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, ফ্লাইটটি নাগপুরের ড. বাবা সাহেব আম্বেদকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে জরুরি অবতরণ করেছে। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম ভারতের একটি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) আছেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় তার চিকিৎসার আপডেট নেওয়া হয়েছে। ক্যাপ্টেন নওশাদ সম্পূর্ণ ভেন্টিলেশনের সহায়তায় বেঁচে আছেন। সন্ধ্যায় উচ্চ পর্যায়ের একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে। এরপর বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রটোকল অনুযায়ী ক্যাপ্টেন নওশাদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হবে।

 

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ক্যাপ্টেন নওশাদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দুই বোন এখন নাগপুরে অবস্থান করছেন। পরিবারের সদস্যরা ক্যাপ্টেন নওশাদের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *