সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে গেছে ৩ জনকে! ২৫ দিনেও খোঁজ মেলেনি তাদের

নজর২৪ ডেস্ক- নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পাঁচরুখী গ্রামের বাসিন্দা মো. নোমান (২৯)। আলিম পর্যন্ত লেখাপড়া করে শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে ছিল তার সংসার। ব্যবসা করে যে আয় হতো তা দিয়েই সংসার চালাতেন।

 

গত ২রা জুন নোমান বান্টিবাজার থেকে বাড়ি ফেরার সময় কয়েকজন বিভিন্ন বয়সের লোক তার মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে কেড়ে নেয় চাবি। তারপর তাকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে একটি টয়োটা হাইয়েস গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় তারা নোমানের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও নিয়ে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা আর নোমানের কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না। খবর- দৈনিক মানবজমিনের

 

তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে। থানা পুলিশ থেকে শুরু করে র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ছোটাছুটি করেও খোঁজ মিলেনি নোমানের। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা নির্বাক হয়ে গেছেন। ২৫দিন ধরে তারা সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ-খবর নিয়েছেন।

 

তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে। থানা পুলিশ থেকে শুরু করে র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ছোটাছুটি করেও খোঁজ মিলেনি নোমানের। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা নির্বাক হয়ে গেছেন। ২৫দিন ধরে তারা সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ-খবর নিয়েছেন।

 

অপেক্ষায় আছেন নোমান কখন বাড়ি ফিরবে। নোমানের চার ও দুই বছর বয়সী দুই শিশু সন্তানেরাও বাবার কথা মনে করে বারবার কাঁদছে আর পথের দিকে তাকিয়ে আছে।

 

শুধু নোমান নয়, ওইদিন একই সময় থেকে নিখোঁজ রয়েছেন একই এলাকার আরও দু’জন। তাদের মধ্যে একজন হলেন, শহিদুল ইসলাম (৩০)। তিনি পাঁচরুখী বাজার জামে মসজিদে দীর্ঘদিন ধরে ইমামতি করেন।

 

আরেকজন হলেন- মো. নাছিম। সে পাঁচরুখী দারুল উলুম মাদ্রাসায় ফাজিলে লেখাপড়া করেন। এই তিনটি পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে বলেছেন, তাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তারা কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়। পরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল। এলাকায় বা অন্য কোথাও তাদের কোনো শত্রু ছিল না। অথচ তাদের সন্তানদের জোরপূর্বক তুলে নেয়া হয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিখোঁজদের সন্ধান চেয়ে আকুল আবেদন করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

 

নিখোঁজ নোমানের বাবা সারোয়ার হোসেন বলেন, আমার ছেলে নোমান ওড়নার ব্যবসা করেন। ঘটনার দিন সকালে বান্টিবাজার থেকে তার ব্যবসার জন্য ওড়নার গ্রে কাপড় কিনে অটোতে পাঁচরুখী ডাইয়িংয়ের উদ্দেশ্যে পাঠায়। পরে তার মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। এ সময় ৩/৪ জন দুস্কৃতিকারী এসে তার মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে যায় এবং আরও দু’জন এসে তাকে একটি হাইয়েস গাড়িতে ওঠায়।

 

তুলে নেয়ার সময় আমার ছেলের পরিচিত একজন এসে তাকে আটকানোর চেষ্টা করলে দুস্কৃতিকারীরা তার বুকে লাথি মেরে ফেলে রেখে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে যায় তারা। মুখোশ পরা থাকায় দুস্কৃতিকারীদের তিনি চিনতেও পারেননি। তুলে নেয়ার সময় আমার ছেলের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক ও নগদ টাকা ছিল। আমরা তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে অনেকবার কল করে সেটি বন্ধ পাই।

 

ছেলের সন্ধান চেয়ে আমি নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিস থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার, আড়াইহাজার থানায় অভিযোগ দিয়েছি। এছাড়া ডিবি, র‌্যাব অফিসে অভিযোগ দিয়েছি। আড়াইহাজার থানায় জিডি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা জিডি নেননি। শুধুমাত্র একটি অভিযোগ নিয়েছেন।

 

তিনি বলেন, আমার ছেলে কোনো দল বা সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়। কারা তাকে কেন তুলে নিয়েছে কিছুই জানি না। যারা তুলে নিয়েছে তাদের পরণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর কোনো পোশাক ছিল না। সাদা পোশাকের লোকজনই তুলে নিয়ে গেছে।

 

তিনি আরও বলেন, বয়স হয়েছে আমার। কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। দশ টাকা আয়ের কোনো ব্যবস্থা নাই। নোমানের আয়েই আমার সংসার চলে। আমার ছেলে যদি কোনো অন্যায় বা অপরাধ করে থাকে এবং কোনো সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে থাকে তবে আইনিভাবে আদালতে তার বিচার হোক। আমি শুধু আমার ছেলেকে চাই।

 

নিখোঁজ ইমাম শহিদুল ইসলামের বাড়ি বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার পশ্চিম টেকানী গ্রামে। ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশপাশি স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে। শহিদুল ইমামতির পাশপাশি নরসিংদীর একটি মাদ্রাসায় কামিল দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করছেন।

 

তার শ্বশুর বুলু মিয়া বলেন, বহু বছর ধরে পাঁচরুখী বাজার জামে মসজিদে শহিদুল ইমামতি করে আসছে। ভালো পরিবারের ছেলে সুনামও আছে তাই মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। কোনো রাজনীতি বা সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না। ঘটনার সময় আমি ওই এলাকায় ছিলাম না। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পেরেছি সাদা পোশাকের লোকজন তাকে ধরে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি আমার জামাতাকে ফেরত চাই। আমার মেয়ে ও নাতি খুব কান্নাকাটি করছে।

 

নিখোঁজ নাছিমের বাবা সিরাজ মিয়া বলেন, ওইদিন সকালে বাড়িতে যাওয়ার সময় আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গেছে। আড়াইহাজার থানায় দুইবার গিয়েছি। কিন্তু তারা জিডি নেয়নি। আমি এবং আমার ছেলের কোনো শত্রু নাই। সে ভালো মোবাইলও চালায় না। সরকারের কাছে অনুরোধ আমার ছেলেকে যেন তারা খুঁজে বের করে দেয়। কে বা কারা নিয়ে গেছে জানি না। আমিতো অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি কিন্তু পাইনি।

 

এদিকে বান্টি বাজারের একটি মার্কেটের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, মার্কেটের ভেতরের একটি দোকান থেকে নিখোঁজ নোমান বের হয়ে পার্কিং করা একটি লাল রঙের মোটরসাইকেল স্টার্ট করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাদা পোশাকের চারজন লোক এসে তার গতিরোধ করে কথাবার্তা শুরু করে। নোমানের পরণে সাদা পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি ছিল। তার কিছুক্ষণ পরে ওই চারজনের তিনজন নোমানকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে একটু সামনে ধরে নিয়ে যান। আর আরেকজন তার মোটরসাইকেলটি হেঁটে নিয়ে যায়। এরপর উভয়পক্ষের মধ্যে কয়েকমিনিট কথা হয়। এরপর নোমানকে তারা ধরে নিয়ে যায়।

 

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিছুর রহমান শনিবার (২৬ জুন) বলেন, ২রা জুন আমি এখানে ওসি হিসেবে ছিলাম না। তাই ওটার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আগের ওসি কি করেছেন তিনি জানেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *