তৌফিকুর রহমান, ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি- চিত্রনায়িকা পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলার দ্বিতীয় প্রধান আসামি তুহিন সিদ্দিকী অমি (৩৩)। জনপ্রিয় এই নায়িকাকে ফাঁদে ফেলতে ষড়যন্ত্রের মুল হোতাও তিনি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্য একাধিক সূত্র জানায়, ক্লাব পাড়ায় অমিও একজন পরিচিত মুখ। তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন একজন নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন। অনেক বছর ধরে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় তিনি কাজ করে ঢাকার আশে পাশে জমি ক্রয় করেন। বর্তমানে তার অঢেল সম্পদ রয়েছে।
একমাত্র সন্তান হওয়ায় এর উত্তরাধিকারী অমি। অমি ৭/৮ বছর আগে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক হন। এরপর দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানি করেন। এ সুযোগে আদম পাচার করে প্রচুর অর্থ আয় করেন। এই অর্থের দাপটে অমি নানা অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার উত্তরা ও আশকোনায় তাদের একাধিক বাড়ি ও প্লট রয়েছে। দক্ষিণখানে রয়েছে তার বালাখানা। এলাকায় এক নামে তাকে সবাই চেনে।
জানা গেছে, এই অমির গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার গুল্ল্যাহ গ্রামে। ধর্ষণচেষ্টার মামলায় আলোচনায় আসা অমির গ্রামে রয়েছে ভিন্ন পরিচয়। সেখানে তার নামে রয়েছে হাসপাতাল। গ্রামের মানুষের জন্য মসজিদ-মাদরাসাও নির্মাণ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে।
গুল্ল্যাহ গ্রামে রয়েছে অমিদের বিলাসবহুল একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। তবে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িটিতে কেউ থাকেন না। মাঝেমধ্যে অমি এবং তার বাবা সেখানে গিয়ে দেখাশোনা করে আবার চলে যান।
জানা যায়, অমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা-ছেলে দুজনই আদম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বাবা-ছেলে গ্রামের মানুষকে আর্থিক সহায়তা, ঘরবাড়ি করে দেওয়াসহ হাসপাতাল, মসজিদ ও মাদরাসাও নির্মাণ করেছেন।
সরেজমিনে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার গুল্ল্যাহ গ্রামে দেখা গেছে, বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়িটির বাউন্ডারি দেওয়াল বিভিন্ন নকশায় সাজানো হয়েছে। পাশের সাদা রঙের বাড়িটি তার চাচার, তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। এ ছাড়া ওই গ্রামেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে অমির নামে একটি হাসপাতাল। হাসপাতালের পেছনেই মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণ করা হয়েছে।
অমির বাবা তোফাজ্জল হোসেন তোফা ১৯৯৫ সালে সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে দীর্ঘ দিন থাকার পর বিদেশ থেকেই শুরু করেন আদম ব্যবসা। এরপর অমিকে আদম ব্যবসায় সম্পৃক্ত করেন তোফাজ্জল। এরপর বাবা-ছেলে মিলে সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, দুবাইসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানো শুরু করেন। এ জন্য ঢাকা ও আশুলিয়া এলাকায় দুটি ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে তাদের।
এ ছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের পাশেই বাসাইলের বয়ড়ার গুল্যাহ এলাকায় ১৮৫ শতাংশ জমির ওপর তৈরি করা হয়েছে অমির নামে একটি জেনারেল হাসপাতাল। পাশেই অমির ছেলে আয়াত ও মেয়ে জান্নাহের নামে সুপার মার্কেট ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যা জান্নাহ গ্রুপ অব কোম্পানি নামে পরিচালিত হচ্ছে। হাসপাতালের পেছনে ২০১১ সালে মক্কা মদীনা হাজী আব্দুল মান্নান ময়মন নেছা কওমি মাদরাসা নামে একটি মাদরাসা, এতিমখানা ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
আব্দুর রউফ নামে আরেকজন বলেন, তারা আগেই থেকে ধনী মানুষ। এলাকার দরিদ্র মানুষদের আর্থিক সহায়তা করে আসছেন। এলাকায় তাদের নামে কোনো অভিযোগ বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য নেই।
গুল্ল্যাহ গ্রামের বাসিন্দা সেলিম খান বলেন, যিনি গ্রামে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ করতে পারেন তিনি লোক হিসেবে খারাপ হতে পারেন না। অমি ও তার বাবা ভাল মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। কেউ হয়তো শত্রুতা করে ফাঁসিয়েছে অমিকে।
সুরুজ মিয়া নামে আরেক এলাকাবাসী বলেন, তাদের বাড়িটি হাজী বাড়ি নামে পরিচিত। এই গ্রাম ছাড়াও অন্যান্য গ্রামের মানুষজনকেও আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াও অনেক মসজিদ মাদরাসায় দান করেছেন। অনেক অসহায় পরিবারের মেয়ের বিয়েতেও দান খয়রাত করেছেন। তবে অমি ছোট থেকেই ঢাকায় থাকত।
স্থানীয়রা জানান, অমির জন্ম ঢাকাতেই। ফলে সেখানেই সে মানুষ হয়েছে। এলাকায় বছরে একবার-দুইবার যেতেন। গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ নানা কাজে তিনি আর্থিক সহায়তা করতেন। গ্রামের মানুষ তাকে ভালো মানুষ হিসেবেই চেনেন।
অমির বাবা তোফাজ্জল হোসেন তোফা বলেন, স্কুলজীবনে নায়িকা পরীমণির সঙ্গে অমির বন্ধুত্ব ছিল। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে ওঠার পর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিল না।
তিনি বলেন, পরীমণি যখন তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তখন সে গ্রামের বাড়িতেই ছিল। অমি বাংলাদেশসহ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার নাগরিক। তার পাসপোর্টে ৭-৮টি দেশের ভিসা লাগানো আছে। অবস্থা এমন হবে জানলে আগে থেকেই তাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতাম। তাহলে তাকে আর জেলে যেতে হতো না।
অমির বাবা আরও বলেন, অমি ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের সদস্য হিসেবে রয়েছে। ভবিষ্যতে ক্লাবগুলোতে হয়তো বড় পদে যেত। এ জন্য প্রতিপক্ষ সামাজিকসহ তার ব্যবসায়িক ক্ষতি করার জন্য নায়িকা পরীমণিকে দিয়ে তাকে মামলার দ্বিতীয় আসামি বানিয়েছে।
উপজেলার হাবলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আকবর আলী জানান, গুল্ল্যাহ গ্রামের তোফা ও পেঙ্গুইন ট্রেনিং সেন্টারের মালিক মিজানের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। শুধু এলাকার মানুষজনই না দেশের বিভিন্ন জায়গার মানুষ তোফার মাধ্যমে বিদেশ গিয়েছেন।
