৩ বছর পর মাকে ফিরে পেল ভাইরাল সেই পথশিশু মারুফ

নজর২৪ ডেস্ক- একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের ফেসবুকে লাইভ করার সময় ক্যামেরার ফ্রেমে ঢুকে পড়ে আলোচিত হয় পথশিশু মারুফ। পরবর্তীতে ঢাকার জজকোর্ট এলাকা থেকে আলোচিত পথশিশু মারুফকে উদ্ধার করে সমাজসেবা অধিদফতরের মিরপুরের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

 

সম্প্রতি মারুফ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মুক্তি পেয়ে তার পরিবারের কাছে ফিরেছে। মঙ্গলবার (১৮ মে) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সহমর্মিতা ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা পারভেজ হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

পারভেজ মারুফের মাকে খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে বলেন, ঈদের পরেরদিন নিজ হাতে সেমাই-নতুন পাঞ্জাবি নিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনও দেখা হয়নি। অবশেষে তার মায়ের সন্ধান পেলাম। তিন বছর আগে মারুফ তার মায়ের কাছ থেকে হারিয়ে যায়। তার বাবা আরও একটা বিয়ে করেছে, মারুফরা দুই ভাই। মা সামান্য ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করত, দুই ভাইকে মানুষ করতে পেরে উঠছিল না। কত না খেয়ে দুই ভাইয়ের জন্য দিন পার করেছে। চোখে অশ্রু নিয়ে তাই বলছিলেন মারুফের মা! তারপরও ছেলেদের চোখের আড়াল করেনি, অথচ মারুফকে তার বাবা নিয়ে আসে তারপর থেকে সে নিখোঁজ, কেউ আর খোঁজ করেনি।

 

মারুফের পরিবারের আয়রোজগারের বিষয়টিকে বেগবান করার বিষয়ে পারভেজ আরও বলেন, পারিবারিকভাবে যেহেতু দুই ছেলেকে নিয়ে চলা কঠিন মারুফের মায়ের, তাই আমরা তাকে কথা দিয়েছি ছোটখাট একটা বিজনেস করার মতো অর্থ ফান্ড রাইজ করে দেব (সেক্ষেত্রে আপনারা এগিয়ে আসবেন আমি আশাবাদী), দোয়া করবেন ছেলেটির জন্য, সব নাটকীয় রুদ্ধশ্বাস দিনগুলো পার করে ছেলেটির জীবনে নতুন দিগন্তের রচনা হলো।

 

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এলাকা থেকে ১৯ এপ্রিল দুপুরে ফেসবুকে লাইভ করেন সময়ের কণ্ঠস্বর নামের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রধান প্রতিবেদক পলাশ মল্লিক।

 

তার কথা বলা প্রায় শেষের দিকে ক্যামেরার ফ্রেমে ঢুকে পড়ে পথশিশু মারুফ। সে বলে ওঠে, ‘এই যে লকডাউন দিছে, মানুষ খাবে কী? সামনে ঈদ। এই যে মাননীয় মন্ত্রী একটা লকডাউন দিছে, এটা ভুয়া। থ্যাঙ্কু।’

 

পরদিন মারুফের চোখে জখমসহ একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। ওই ছবি শেয়ার করে অসংখ্য ফেসবুক ব্যবহারকারী অভিযোগ তোলেন, লকডাউন নিয়ে সরকারি অবস্থানের বিরোধিতা করার কারণেই তাকে পুলিশ বা ছাত্রলীগ কর্মীরা মার.ধর করেছে।

 

তবে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, মারুফের সঙ্গে তার এলাকার পথশিশুদের মারা.মা.রিতেই জখমের ঘটনাটি ঘটে। সাংবাদিক পলাশের লাইভের পরদিন এক ব্যক্তি শিশুটির সঙ্গে আদালত এলাকায় একটি সেলফি তোলেন। সেই সেলফি থেকে শিশুটির ছবিটি কেটে নিয়ে ‘মনগড়া’ অভিযোগ তুলে ভাইরাল করা হয় ফেসবুকে।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়া মারুফকে পরে উদ্ধার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। এরপর শিশুটিকে আদালতের আদেশের ভিত্তিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মিরপুরের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল আশ্রয়কেন্দ্রে।

 

মারুফ নোয়াখালী জেলার হাতিয়ার সাগরিয়ার জো খালী এলাকার মহিমা খাতুনের ছেলে। ২০০৪ সালে গাজীপুরের আলমগীর হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় মহিমার। মারুফ হল তার প্রথম সন্তান। দ্বিতীয় সন্তান প্রসবকালে আরেক নারীকে বিয়ে করেন আলমগীর। আলমগীরের দ্বিতীয় বিয়ের পর সন্তানদের নিয়ে শ্বশুরালয়ে আশ্রয় নেন মহিমা। ছিলেন ৬ বছর।

 

মহিমা খাতুন বলেন, প্রথম দিকে মানুষের বাসায় কাজ করতাম। মারুফের বাবা আমাদের ভরণপোষণ দিত না। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নিই। সেখানে সন্তানদের নিয়ে নতুন সংগ্রাম শুরু করি। কিন্তু ২০১৮ সালে ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা। বেড়ানোর কথা বলে সৎ মা তাকে গাজীপুরে নিয়ে যায়। পরে তার বাবা জানান, দাদার বাড়ি গাজীপুর থেকে হারিয়ে যায় তার সন্তান। মায়ের মন, কিছুতেই বাধা মানে না। সন্তানের খোঁজে ছুটে যান গাজীপুর। থাকেন এক সপ্তাহ। দুই ছেলের কারো খোঁজ পাননি মহিমা। সন্তানদের খোঁজ না পেয়ে ফিরে আসেন চট্টগ্রামে। ফিরে যান সেই পোশাক কারখানায়। সেই থিতু হন।

 

তিন বছর ধরে সন্তানকে হারিয়ে পথে পথে ঘুরছেন মহিমা। আশায় ছিলেন, একদিন দেখা পাবে বুকের ধনদের। ভাইরাল হওয়ার পর নতুন স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার চোখে-মুখে এখন ভাসছে সন্তানের চেহারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *