নজর২৪ ডেস্ক- রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলতে গিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েছে হেফাজতে ইসলাম। বাধ্য হয়েছে বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করতে। কাগজে-কলমে হেফাজত অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হলেও সংগঠনটির জন্ম থেকে অদ্যাবধি তাদের কর্মকাণ্ড ধর্মীয় চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনীতির মাঠে যখন যেদিকে সুবিধা পেয়েছেন তাদের পক্ষেই কাজ করেন সংগঠনটির নেতারা। হেফাজত কখনো কখনো ব্যবহার হয়েছে অন্যের ঘুঁটি হিসেবেও। ফলে ইসলামের রীতিনীতি প্রচার ও প্রসারে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে যে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে দাবি করা হয় তা এখন দ্বিধাবিভক্ত ও বিতর্কিত হয়ে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হেফাজতে ইসলামের দুই ধারা ভিন্ন পথে হাঁটছে। সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের কেউ ব্যস্ত সরকারের সঙ্গে সমঝোতায়, কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে চলে গেছেন আত্মগোপনে।
ঠিক বিপরীত চিত্র প্রয়াত আমির আল্লামা আহমদ শফীর অনুসারীদের। তারা সদ্য বিলুপ্ত কমিটির বিতর্কিত কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যস্ত সংগঠন গোছাতে। এমনকি ঝিমিয়ে থাকা নেতাকর্মীদের চাঙা করে মাঠে নামার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা।
আল্লামা আহমদ শফীর অনুসারী হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘আল্লামা আহমদ শফীর গঠন করা কমিটি নিয়ে হেফাজতে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে। সিনিয়র নেতা ও দেশের শীর্ষ আলেমদের নিয়ে দ্রুত বৈঠক হবে। ওই বৈঠক থেকে হেফাজতে ইসলামের পুনর্জাগরণের ঘোষণা দেওয়া হবে’।
বর্তমান কমিটি সংগঠনের গঠনতন্ত্র মেনে হয়নি দাবি করে মঈনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের কমিটিতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। তারা আলেম-উলামাদের সরকার ও সহিংসতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটা আল্লামা শফীর আদর্শচ্যুতি এবং তাঁর সঙ্গে গাদ্দারি। এটি করা হয়েছে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য’।
বিলুপ্ত কমিটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুফতি হারুন ইজহার বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের কমিটি বিলুপ্ত করে পুনর্গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা যথাযথভাবে হতে হবে। তা না হলে হেফাজতে ইসলামকে আরো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে।’
বাবুনগরীর অনুসারী এক নেতা বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের বিলুপ্ত কমিটির নেতাকর্মীরা বর্তমানে সংগঠন নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা করছে না। তাদের সবাই গণগ্রেপ্তার ও নাশকতার মামলা নিয়ে টেনশন ও আতঙ্কে আছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রমে সাধারণ নেতাকর্মীরা আসবে না, এটা নেতাদের জানা আছে। তাই বিলুপ্ত কমিটির পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে না আপাতত’।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে নাশকতার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ বেশ কয়েকজন নেতাসহ শতাধিক বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। নাশকতা মামলা এবং আল্লামা শফী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন শীর্ষ নেতারা। গ্রেপ্তার এড়াতে শীর্ষ নেতাদের অনেকে এখন আত্মগোপনে।
চরম এ সংকটময় পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ও টেনশনে দিন কাটছে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী অনুসারীদের। তার ওপর গত শনিবার রাতে হঠাৎ ফেসবুক লাইভে এসে কেন্দ্রীয় ও মহানগর কমিটিগুলো ভেঙে দেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। এতে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় সংগঠনে।
আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারীদের কোণঠাসা সুযোগে ফের সক্রিয় হয়েছেন প্রয়াত আমির আল্লামা আহমদ শফীর অনুসারীরা। তারা বর্তমান কমিটির বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন নানাভাবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ঝিমিয়ে থাকা নেতাকর্মীদের ফের সক্রিয় করছেন।
গত কয়েক দিনে দেশের সব বড় বড় মাদরাসার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন শফীর অনুসারীরা। আল্লামা আহমদ শফী অনুসারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কয়েকজন সিনিয়র নেতা পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া এরই মধ্যে প্রয়াত আমিরের ২৫ হাজার মুরিদ ও খলিফার তালিকা তৈরি করে তাদের সক্রিয় করার প্রক্রিয়া চলছে।
আল্লামা শফীর ছাত্র-অনুসারীদের নিয়েই মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মাঠে সক্রিয় হচ্ছে ‘আসল হেফাজতে ইসলাম’।
আগের সংবাদ পড়ুন-
হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত তিন কারণে, আহ্বায়ক কমিটি গঠন ‘কৌশল’
নজর২৪ ডেস্ক- তিন কারণে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কারণগুলো হলো- গ্রেপ্তার, মামলা ও ধরপাকড় এড়ানো; চাপে পড়ে অনেক নেতার পদত্যাগ এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনা। এ ছাড়া বড় ধরনের ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সংগঠনটির শীর্ষনেতারা।
হেফাজতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর ঘোষণার পাঁচ মাসের মধ্যেই ভেঙে দেওয়া হলো হেফাজতের এ কমিটি।
গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ভিডিওবার্তায় কেন্দ্রীয়সহ ঢাকা মহানগরের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এর তিন ঘণ্টার মধ্যেই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
হেফাজতের কমিটি বিলুপ্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন, সরকারের ধরপাকড়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছে হেফাজত। কেউ বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আপাতত কিছু দিন চুপচাপ থেকে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আবারও সক্রিয় হবেন তারা।
জুনায়েদ বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, প্রশাসনিক নানামুখী চাপের পাশাপাশি ঢাকায় সংগঠনের নেতৃস্থানীয়দের একটি অংশ থেকেও চাপ ছিল হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত করার বিষয়ে। এ ছাড়া সর্বশেষ সংগঠনের হাটহাজারীর নেতাদের একটা অংশও গ্রেপ্তার থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন করে মামলার চাপ। ২৬ মার্চের সহিংসতার ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার হাটহাজারী থানায় আরও তিনটি মামলা হয়। তাতে হেফাজতের কমিটিতে থাকা হাটহাজারীর অনেককে আসামি করা হয়। এর মধ্যে দুটি মামলায় বাবুনগরীকেও আসামি করা হয়।
যদিও বাবুনগরী এক সপ্তাহ আগে সরকারের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘নেতাদের তালিকা দিন, প্রয়োজনে তাঁদের নিয়ে জেলে যাব।’ হঠাৎ সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি রোববার রাত ১১টায় কমিটি বিলুপ্ত করেন। এক ঘণ্টা পর হেফাজতে বাবুনগরীদের বিরোধী পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁরা শিগগির নতুন কমিটি করবেন। এরপর রাত আড়াইটায় বাবুনগরীদের পক্ষ থেকে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এর আগে রোববার বিকেলে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকেরা প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকবেন। এদিন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসায় আল-হাইআতুলের স্থায়ী কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। তাঁদের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়ে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হাইআতুল উলয়ার এ সিদ্ধান্তের প্রভাব এবং চাপও পড়েছে হেফাজতের কমিটি বিলুপ্তির ক্ষেত্রে। যদিও হাইআতুল উলয়া মূলত কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। এর চেয়ারম্যান যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহমুদুল হাসান। তিনি ১৩ এপ্রিল সরকার বরাবর একটি চিঠি দেন। তাতে তিনি সরকারপ্রধানের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া নানা মামলায় আটক নিরীহ আলেম ইমামদের মুক্তি ও ঈদের পর মাদ্রাসা খুলে দেওয়ার দাবি করেন।
হাটহাজারী মাদ্রাসার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইচ্ছানুযায়ী হেফাজতে ইসলামের কমিটি বিপ্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার দুপুরের পর থেকে হাটহাজারীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়তি মোতায়েন ছিল। সন্ধ্যার পর তৎপরতা বেড়ে যায়। হেফাজতের আমির কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়ে ভিডিও বার্তা দেওয়ার পর মাদ্রাসা এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চলে যায়।
অবশ্য হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ‘দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়’ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার কথা উল্লেখ করেন। সাড়ে তিন ঘণ্টা পর বিলুপ্ত কমিটির মহাসচিব (বর্তমানে সদস্যসচিব) নুরুল ইসলাম জিহাদী যখন নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন, তাতেও ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ কথা বলেন।
সেই বিশেষ পরিস্থিতিটা কী? জানতে চাইলে জুনায়েদ বাবুনগরী কোনো মন্তব্য করেননি। একই প্রশ্ন নুরুল ইসলাম জিহাদীকেও করা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে বাবুনগরী জবাব দেবেন। আমি শুধু তাঁকে নকল করেছি।’
বিশেষ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা না দিলেও হেফাজত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। গভীর রাতে আবার আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে কৌশলগত কারণে, সংগঠন হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে।
একই সূত্র আরও জানায়, অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত আছেন, এমন ব্যক্তিদের হেফাজত থেকে দূরে রাখার বিষয়ে সরকারি মহল থেকে চাপ আছে। এমন ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে হেফাজতের কমিটিতে রাখা না রাখার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে কমিটি বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে।লুপ্ত করা হয়। এর পেছনে হাটহাজারী এলাকার সাংসদ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং হেফাজতের কমিটিতে প্রভাবশালী স্থানীয় দুজন নেতারও সংশ্লিষ্টতা ছিল। ওই দুই নেতাও গ্রেপ্তারের তালিকায় ছিলেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তাঁরা মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাঁরা সাংসদের সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতা চান। তখন হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
হেফাজতের একটি সূত্র জানায়, কমিটি বিলুপ্ত না হলে হাটহাজারী মাদ্রাসায় গ্রেপ্তার অভিযান এবং হাটহাজারী মাদ্রাসাসহ হেফাজত নেতাদের বিভিন্ন মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হতে পারে বলেও তাঁদের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
