নজর২৪ ডেস্ক- তেজগাঁওয়ের গ্রামীণফোনের সার্ভিস সেন্টারে কর্মরত এক কর্মীর সহযোগিতায় সার্ভার থেকে গ্রাহকের তথ্য চুরির পর তাদের ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকার হাতিরঝিল থানা পুলিশ। ওই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন পারভীন আক্তার নূপুর নামে এক নারী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দৃশ্যমান কোনও পেশা না থাকলেও সপ্তম শ্রেণি পাস নূপুর থাকেন গুলশানের নিকেতনে। তার ফ্ল্যাট ভাড়া মাসে লাখ টাকা। তার মেয়ের স্কুলের বেতন প্রতিমাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা।
সে বনানীর ১১নং রোডের ই-ব্লকের গ্রিন ডিলাক্স হাউজ নামের একটি জিমে নিয়মিত যায়। সেখানে প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা বিল দেয়। গুলশান থানায় সে একবার অভিযোগ করেছিল যে তার ৬টি লিপস্টিক চুরি হয়েছে, যেগুলোর দাম ৯০ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে বুধবার (৯ ডিসেম্বর) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছে পারভীন আক্তার নূপুর। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে। তার টার্গেট ছিল মূলত ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা। টার্গেট করা ব্যক্তির সব ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে পরিবারের সব সদস্যকে জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে সে।’
জানা গেছে, এমনকি ভুয়া আইনজীবীর মাধ্যমে ফোন করে নারী নি’র্যাতন এবং ধ’র্ষ’ণ মামলার হুমকি দিয়ে ভয় দেখানো হয়। এই চক্রকে টার্গেট করা ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করে গ্রামীণফোনের সার্ভিস সেন্টারের কর্মী রুবেল মাহমুদ অনিক।
চক্রের প্রধান পারভীন আক্তার নূপুর, তার বোন শেফালি বেগম, গ্রামীণফোনের কর্মী রুবেল মাহমুদ অনিক এবং নূপুরের সহযোগী শামসুদ্দোহা খান বাবু নামে ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরপরই বেরিয়ে এসেছে এ ধরনের ভয়ঙ্কর প্রতারণার নানা তথ্য।
গত বৃহস্পতিবার থেকে রবিবারের মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, হাতিরঝিল ও বাড্ডা এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। হাতিরঝিল থানায় দায়ের করা প্রতারণা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুই মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আইনজীবী পরিচয়দানকারী ইসা নামে চক্রের এক সদস্য এখনও পলাতক।
৫-৬ সদস্যের এই সংঘবদ্ধ চক্রটি উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের টার্গেট করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ষাটোর্ধ্ব বয়সের লোকজনই তাদের মূল টার্গেট। চক্রের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার ২০-২৫ জনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
তাদের প্রতারণার শিকার তেমনই একজন আব্দুস সালাম (ছদ্মনাম)। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্বার্হী পরিচালক তিনি। বছর দেড়েক আগে পারভীন আক্তার নুপুর নামে এক নারী তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করে তার কাছে চাকরি চান। পরে ওই নারী তার অফিসে গিয়ে দেখা করেও চাকরির আবদার করেন।
ওই ব্যক্তি নুপুরকে জানান, প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার কিছু নিয়ম আছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করুন। তারপর আমি দেখবো কী করা যায়। কিন্তু পরে এই নারী কোনো আবেদন করেননি। তবে মাঝে-মধ্যে ফোনে নিজের অভাবের কথা জানাতেন। চাইতেন টাকা-পয়সা। আব্দুস সালাম তাকে কোনো ধরনের সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এবার ভোল পাল্টে ফেলেন নুপুর।
নুপুর তাকে বলেন, ‘আপনি এতো দিন আমার সঙ্গে প্রেম করেছেন, প্রেমের দাম দেবেন না! দাবি করে বসেন, ৫ লাখ টাকা। টাকা না দিলে পরিবার, বন্ধু ও অফিসের সহকর্মীদের গোপন প্রেমের জানিয়ে দেয়ার হুমকি দেন নুপুর। লোক-লজ্জার ভয়ে বাধ্য অল্প কিছু টাকাও দেন তিনি।
রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় একটি প্রতারণার মামলা সূত্র ধরে পুলিশের তদন্তে নুপুরের অসংখ্য প্রতারণার কাহিনী বেরিয়ে আসে। পুলিশ খোঁজ পায় একটি চক্রের। যাদের টার্গেট সমাজের ধনাঢ্য , শিল্পপতি ও বড় বড় ব্যবসায়ী।
পরে এ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের একজন শামসুদ্দোহা খান বাবু। যিনি একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করেন। কাজের সুবাদে ধনাঢ্য, শিল্পপতি ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চক্রের প্রধান নুপুরকে দিতেন। এরপর নুপুর সমাজকর্মী বা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে সরাসরি বা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতেন। সেইসব কথোপকথন রেকর্ড করে রাখতেন। যেখানে তারা ব্যক্তিগত কথাগুলো সংগ্রহে রাখতেন। পরে সেগুলো দিয়ে করতেন ব্ল্যাকমেইলিং।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার চক্রের আরেক সদস্য রুবেল মাহমুদ অনিক। তিনি কাজ করতেন গ্রামীণফোনের কাস্টমার সার্ভিস সেন্টারে। টাকার বিনিময়ে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির সিমের ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করতেন। ছয় জন গ্রাহকের তথ্যের বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা নিতেন অনিক।
অনিকের দেয়া তথ্যের সূত্রধরে শুরু হয় প্রতারণা। টাকা না দিতে চাইলে প্রতারণার শেষ ধাপে হাজির হতেন নুপুরের বড় বোন শেফালী বেগম। টাকা না দিতে চাইলে বোনের সঙ্গে অ’নৈ’তিক সম্পর্কের অভিযোগ নারী নি’র্যাতন মামলার ভয় দেখাতেন। সম্মানের ভয়ে টাকা দিতে বাধ্য হতেন অনেকেই।
