প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছিলেন অভিনেত্রী, পরিচালক মেহের আফরোজ শাওন। তাকে বিকাশে ৩১ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয় এবং তিনি তা পাঠিয়ে দেন। এরপর লাপাত্তা প্রতারকরা।
প্রতারকদের একজনকে বুধবার (২৫ আগস্ট) গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আর তখনই প্রকাশ্যে আসে শাওনের প্রতারিত হওয়ার তথ্য।
কীভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন শাওন? সেই ঘটনা তিনি বলেছেন নিউজবাংলাকে।
ঘটনার শুরু জানিয়ে শাওন বলেন, জুনের ১৭ কিংবা ১৮ তারিখে আমাকে একজন ফোন করে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার পারসোনাল সেক্রেটারি (পিএস) হিসেবে পরিচয় দেন। জানান যে, ডেপুটি স্পিকার আমার সঙ্গে কথা বলতে চান।
আমি বলি, ঠিক আছে। ফোন নিয়ে একজন নিজেকে ফজলে রাব্বী বলে পরিচয় দেন। আমার খোঁজখবর নেন। নুহাশ পল্লি ঠিকঠাক আছে কি না, পরিচালনা করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না, খোঁজখবর নেন।
একপর্যায়ে তিনি বলেন যে আমি আসলে আপনি আপনি করে না বলে তোমাকে তুমি করে বলি। তোমার আম্মা তো আমার কলিগ ছিলেন।
আমিও ভাবলাম ঠিকই তো, আমার আম্মা এমপি ছিলেন। সেই হিসেবে তিনি আমার আম্মার কলিগই ছিলেন। সে জন্য আমিও বলি, অবশ্যই আপনি আমাকে তুমি করে বলেন।
একপর্যায়ে তিনি বলেন যে নুহাশ পল্লিতে অস্ট্রেলিয়ান একটা এনজিও গ্রুপ বেড়াতে গিয়েছিল, তারা খুব পছন্দ করেছে জায়গাটা। এনজিওটি অফিশিয়ালি একটা অনুদান দিয়েছে হুমায়ূন আহমেদের নামে একটা কিছু করার জন্য। আমি যতদূর জানি তুমি একটা মিউজিয়াম করতে চাও, তো অনুদানটা তুমি নিতে পার। আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে তোমার কাছে অনুদানটা পৌঁছে দেয়ার।
আমি ভাবলাম, এমন হলে তো আমার জন্য সম্মানজনক। সম্মতি পেয়ে তিনি বলেন, এটা তো অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত উপসচিবকে তোমার মোবাইল নম্বর দিচ্ছি। উনি ফোন করে তোমার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে নেবেন।
শাওন বলেন, ওই দিনই দেড়-দুই ঘণ্টা পর আমার কাছে ফোন আসল অতিরিক্ত উপসচিব পরিচয় দেয়া একজনের। আমার ফোনে ট্রু কলার আছে, সেখানেও দেখলাম তার নাম মিলে গেছে এবং পাশে অর্থ মন্ত্রণালয়ও লেখা আছে। তো আমি কথা বললাম।
আমার মা যখন এমপি ছিলেন, তখন আমি দেখেছি, তাদের আলোচনা, ভাষা, সম্বোধন কেমন হয়। এই প্রতারকরাও সেই ভাষা, ভদ্রতা একদম পুরো মেইনটেইন করেছে। তাদের কথা শুনে আমার একটুও সন্দেহ হয়নি।
তারা সুন্দর করে ম্যাডাম সম্বোধন করে অ্যাকাউন্ট নম্বর জানতে চাইলেন, অনুদানের টাকার পরিমাণটাও ভগ্নাংশ রেখে, দশমিক রেখে জানালেন।
১৬ লাখ টাকার অনুদানে ট্যাক্স বাবদ ২৫ হাজার টাকা আসে বলে জানান। আরেকটি চার্জ মিলিয়ে ৩১ হাজার ৮৫০ টাকা বিকাশ করতে বলেন। তাহলে তারা প্রসেসিং শুরু করতে পারেন বলে জানান।
শাওন আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এই জায়গাটাতে আমি একটু ভুল করেছি। আমাকে যেহেতু সরকারি ফি-এর কথা বলে টাকাটা নিয়েছে, সেখানে তো রিসিট থাকবে বা কাগজপত্র থাকবে।
‘হুমায়ূন আহমেদ, তার মিউজিয়াম আমার কাছে একটা ইমোশনাল ব্যাপার। আমি এসব বিষয় মাথায় নিয়ে ভুল করে ফেলেছি। আমি সেদিনই বিকাশ করি। এক বারে ৩১ হাজার টাকা যায় না, তাই দুই ধাপে বিকাশ করলাম।’
শাওন আরও বলেন, বিকাশে টাকা পেয়ে ডেপুটি স্পিকার পরিচয় দেয়া ব্যক্তি ফের ফোন করেন। তিনি অনুদানের চেকটা অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে হাতে হাতে দিতে চান। অস্ট্রেলিয়ান দুই-তিনজন কর্মকর্তা নাকি দেশেই আছেন, তারা নুহাশ পল্লিতে চেক পৌঁছে দেবেন, রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকলে তিনিও আসতে চাইলেন। ২০-২৫ জনের খাবারের আয়োজন করতেও বলেন তিনি। তেমন কিছু না সাদা ভাত, একটু সবজি, ডাল, মাছ। লোক বাড়তেও পারে। সেটি তিনি আমাকে পরদিন জানাবেন।
সত্যি বলতে, তারা এত স্মার্ট যে আমি সব বিশ্বাস করেছিলাম। তাদের কথা অনুযায়ী খাবারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দিলাম নুহাশ পল্লির ম্যানেজারকে।
পরদিন আমি ম্যানেজারকে খবর নিতে বললাম। তখন ম্যানেজার জানান সেই ফোন বন্ধ। এরপর আমি চেষ্টা করে দেখলাম, সেই নম্বর বন্ধ, সেই উপসচিবের ফোন বন্ধ। তখন আমার মনে হলো- আমি বোকামিটা করে ফেলেছি।
ঘটনা বুঝে এক দিন পরই আমি ধানমন্ডি থানায় রিপোর্ট করি। অনেকেই আমাকে বলেছিল যে অপরাধী ধরা পড়বে না। কিন্তু আমি ধানমন্ডি থানা ও ডিবির কাছে কৃতজ্ঞ যে অপরাধী ধরা পড়েছে।
টাকার পরিমাণটা যাই হোক, আমার মনে হয়েছে, আমার মতো সচেতন মানুষ যদি এ রকম ভুল করে ফেলতে পারে, তাহলে আরও অনেকেই এ রকম ভুল করতে পারে।
