আন্তর্জাতিক ডেস্ক- জটিল নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জয় এখনও নিশ্চিত হয়নি। প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনের লড়াইয়ে এখনও আশা ছাড়েননি ট্রাম্প। কিন্তু এরই মধ্যে এক বিরল রেকর্ড করে ফেললেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ ভোট পেলেন তিনি। এর আগে এই রেকর্ড ছিল প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দখলে।
২০০৮ সালে ওবামা পেয়েছিলেন ৬ কোটি ৯০ লক্ষের কিছু বেশি ভোট। অর্থাৎ ৬ কোটি ৯০ আমেরিকাবাসী ২০০৮ সালে ওবামাকে (Barack Obama) প্রেসিডেন্ট হিসেবে চাইছিলেন। বিডেন ইতিমধ্যেই মোট ৭ কোটি ভোটের গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছেন। এখনও বেশ কয়েকটি রাজ্যের ভোটগণনা বাকি। স্বাভাবিকভাবেই বিডেনের মোট ভোটের সংখ্যা আরও অনেকটা বাড়বে। উল্লেখ্য, এখনও পর্যন্ত সবকটি রাজ্যেই সমানে সমানে টক্কর হয়েছে দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর। মজার কথা হল বিডেন একা নন, ট্রাম্পও এবার আগের তুলনায় অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন। এবং তিনিও বারাক ওবামার রেকর্ড ভাঙার কাছাকাছি।
এখনও পর্যন্ত যা খবর তাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (Donald Trump) পেয়েছেন ৬ কোটি ৭৩ লক্ষের বেশি ভোট। অর্থাৎ ট্রাম্পের থেকে এখন প্রায় ২ কোটি ৭০ লক্ষ ভোটে এগিয়ে বিডেন। আমেরিকার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, আরও অন্তত ২ কোটি ৩০ লক্ষ ভোট গণনা বাকি। ফলে ট্রাম্পের কাছেও সুযোগ আছে ওবামার সেই রেকর্ড টপকে যাওয়ার। তবে মোট ভোটের নিরিখে বিডেনকে যে তিনি আর কোনওভাবেই টপকাতে পারবেন না সেটা নিশ্চিত। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মোট ভোটের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায় আমেরিকাবাসী এবারের ভোটে পরিবর্তন চাইছিলেন।
যদিও সরাসরি কোন প্রার্থী কত ভোট পেলেন, তার উপর আমেরিকার নির্বাচনের চুড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করে কোন প্রার্থী কতগুলি ‘ইলেক্টোরাল ভোট’ জিতলেন তার উপর। আর এখনও পর্যন্ত বিডেন বা ট্রাম্প কেউই ইলেক্টোরাল কলেজে’র নিরিখে ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারেননি। ৫৩৮ আসনের ‘ইলেক্টোরাল কলেজে’ ম্যাজিক ফিগার ২৭০। আপাতত ২৬৪টি ইলেক্টোরাল ভোট বা আসন জিতে হোয়াইট হাউস দখলের পথে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী বিডেন (Joe Biden)। অপরদিকে ২১৪টি আসন পেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের লড়াইয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্প।
এদিকে পরাজয় আভাস পেয়ে ট্রাম্প শিবিরে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে সুইং স্টেট উইসকনসিনের ভোট পুনর্গণনা করার আবেদন করবে বলে জানিয়েছে তারা। আর রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া ও জর্জিয়াতে ভোট গণনা বন্ধের দাবিতে মামলা করেছে রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী প্রচারণা শিবির। ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ অবশ্য অনুমিতই ছিল। কারণ, শুরু থেকেই তিনি আইনি লড়াইয়ের হুমকি দিয়ে আসছিলেন।
তবে নিজেকে এখনই বিজয়ী বলতে নারাজ বাইডেন। ভোট গ্রহণ শেষে ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যে দেওয়া আনুষ্ঠানিক এক ভাষণে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বলেন, ‘আমি এখানে বিজয় ঘোষণা করতে আসিনি। কিন্তু বলতে এসেছি, ভোট গণনা শেষ হলে আমার বিশ্বাস আমরাই জিতব।’
এক নজরে জো বাইডেন
পুরো নাম জোসেফ রবিনেট বাইডেন জুনিয়র, জো বাইডেন হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম ভাইস প্রেসিডেন্ট। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে দুই মেয়াদে কাজ করেন। ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ডেলাওয়ার থেকে সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জন্ম: বাইডেনের জন্ম ১৯৪২ সালের ২০ নভেম্বর পেনসিলভানিয়ার স্ক্রানটনে। স্ক্রানটন, নিউ ক্যাসল কাউন্টি ও ডেলাওয়ারে তাঁর বেড়ে ওঠা। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় তিনি।
বাবা-মা: বাবা জোসেফ রবিনেট বাইডেন সিনিয়র, মা ক্যাথরিন ইউজেনিয়া ফিনেগান। তাঁর মা আইরিশ বংশোদ্ভূত।
শিক্ষা: বাইডেন ডেলাওয়ার ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে ডিগ্রি নেন।
পরিবার: সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বাইডেন ১৯৬৬ সালের নিলিয়া হান্টারকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে তিন সন্তান রয়েছেন—জোসেফ আর ‘বিউ’ বাইডেন, রবার্ট হান্টার ও নাওমি ক্রিস্টিনা। নিলিয়াকে তিনি বলেছিলেন, ৩০ বছর বয়সের মধ্যে সিনেটর হওয়ার স্বপ্ন তাঁর। সিনেটর হওয়ার পর তাঁর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া। ১৯৭২ সালে বড় দিনের আগে ক্রিসমাস ট্রি কিনতে গিয়ে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিলিয়া নিহত হন। পরে ১৯৭৩ সালে বাইডেন জিল ট্রেসি জ্যাকবকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে অ্যাশলে ব্লেজার নামে এক কন্যা সন্তান রয়েছে।
রাজনৈতিক জীবন: ১৯৭০ সালে ডেলাওয়ারের নিউ ক্যাসল কাউন্টির কাউন্সিলম্যান নির্বাচিত হন জো বাইডেন। এরপর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ৩০ বছর বয়সের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় তাঁর। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন জনপ্রিয় রিপাবলিকান সিনেটর স্যালেব বগসের বিপক্ষে ডেমোক্রেটিক দল থেকে প্রার্থী হন তিনি। তারপর নাম লেখান ইতিহাসে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী পঞ্চম সিনেটর নির্বাচিত হন।’ ৭৩ থেকে টানা ২০০৯ সাল পর্যন্ত সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৮৭ সালে একবার ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেনশিয়াল প্রাইমারিতে লড়ার ঘোষণা দেন বাইডেন। তবে অসুস্থতার কারণে ১৯৮৮ সালে প্রাইমারির শুরুতে ক্ষান্ত দেন তিনি। ২০০৭ সালে আবার প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় প্রাইমারিতে নামেন। সেই যাত্রায় তিনি বারাক ওবামা আর হিলারি ক্লিনটনের বিপক্ষে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। পরে ২০০৮ সালে ওবামা তাঁকে রানিংমেট হিসেবে বেছে নেন। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০: ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল এক ভিডিওবার্তায় বাইডেন ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রাইমারিতে লড়াইয়ের আভাস দেন। দলীয় প্রাইমারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিস (যিনি তাঁর বর্তমান রানিংমেট), ভারমন্টের সিনেটর উদারপন্থী বার্নি স্যান্ডার্স, ম্যাসাচুসেটসের এলিজাবেথ ওয়ারেন, পেটি বুটেগিগ, অ্যামি ক্লুবেচারকে পেছনে ফেলে তিনি ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। জাতীয় পর্যায়ে বেশির ভাগ জনমত জরিপে তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
