নজর২৪ ডেস্ক- রাজধানীর চকবাজারে হাজী সেলিমের রাজকীয় ভবন ‘চান সরদার দাদা বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন হাজী সেলিমের আলোচিত পুত্র ইরফান সেলিম। ওই সময় তিনি মদ্যপ ছিলেন। র্যাব সূত্র জানায়, সোমবার দুপুরে গ্রেফতারের সময় ইরফান মদ্যপ অবস্থায় ছিল। রাত সাড়ে ১২টায় র্যাব-৩ থেকে কারাগারে পাঠানোর আগ পর্যন্ত নেশাগ্রস্থ ছিলেন তিনি।
রবিবার রাত থেকে অভিযানের আগ পর্যন্ত পান করেছেন আড়াই বোতল বিদেশী মদ। স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে একসঙ্গে এতো মদপান করেছেন বলে জানান তিনি।
র্যাবের অভিযানকালে চকবাজারের রাজসিক প্রাসাদ ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ী’র চতুর্থ তলায় অবস্থান করছিলেন ইরফান। আর তার স্ত্রী (নোয়াখালী-৪ আসনের এমপি একরাম চৌধুরীর মেয়ে) তখন ভবনের তৃতীয় তলায় ছিলেন।
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ৯ তলা এ বাড়িতে অভিযানে ঢুকেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট, র্যাব-৩ ও র্যাব-১০ এর সদস্যরা। ওই সময় হাজী সেলিমের ওই পুত্র মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। তিনি গ্রেফতার করতে যাওয়া র্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন।
অভিযানে অংশগ্রহণকারী এক র্যাব কর্মকর্তা জানান, ৪ তলার ইরফানের কক্ষটি ভেতর থেকে লক করা ছিল। বাড়ির কেয়ারটেকারকে সঙ্গে নিয়ে সেই রুমে যান অভিযানকারীরা। কেয়ারটেকারের ডাকে দরজা খুলেন ইরফান। এসময় তিনি ঢলতে ছিলেন। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মকর্তাদের দেখে ইরফান বলতে থাকেন- হু আর ইউ? অ্যাম আই এ ক্রিমিনাল? উইল ইউ অ্যারেস্ট মি?।
র্যাবের একটি সূত্র জানায়, র্যাবের অভিযানের আগেই বাড়ির আশপাশের মোড়ে মোড়ে ইরফান সেলিমের লোক দাঁড়ানো ছিল।
র্যাবের ধারণা, ওয়াকিটকি দিয়ে পুরো এলাকা নজরদারি করছিল। ওই বাড়ি থেকে একটি ওয়ারলেস নেটওয়ার্ক স্টেশন উদ্ধার করা হয়েছে। যেখান থেকে ৩৮টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াকিটকি পাওয়া গেছে। যেগুলো সাধারণত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করেন।
এ রুমের একপাশে থাকতেন হাজী সেলিমের ছেলে এরফান সেলিম। পাশের আরেকটি রুমে থরে থরে সাজানো আরও নানা ডিভাইস আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহৃত ওয়াকিটকি আর ড্রোন ক্যামেরাসহ নানা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি।
এমনকি মিলেছে হ্যান্ডকাপও। তৃতীয় রুমের বিছানার ম্যাট্রেস উঠানোর পরই দেখা যায় গুলিভর্তি একটি বিদেশী অবৈধ পিস্তল আর বিভিন্ন পরিচয়পত্র। আছে দেশী-বিদেশী নানা ব্রান্ডের মাদকদ্রব্যও।
র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরফান সেলিমের ৪তলার বেডরুমে একটি মদের খোলা বোতল এবং একটি বক্সে আরও বেশ কয়েকটি বিদেশী মদের বোতল পাওয়া গেছে। তাকে মদ্যপ অবস্থায় আটক করা হয়।
উল্লেখ্য, রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিমের সংসদ সদস্য লেখা সরকারি গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর করা হয়। রাতে এ ঘটনায় জিডি হলেও সোমবার ভোরে হাজী সেলিমের ছেলেসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওয়াসিফ।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ইরফানের গাড়ি ওয়াসিমকে ধাক্কা মারার পর নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিম সড়কের পাশে মোটরসাইকেলটি থামান এবং গাড়ির সামনে দাঁড়ান। নিজের পরিচয় দেন। তখন গাড়ি থেকে আসামিরা একসঙ্গে বলতে থাকেন, তোর নৌবাহিনী/সেনাবাহিনী বের করতেছি, তোর লেফটেন্যান্ট/ক্যাপ্টেন বের করতেছি। তোকে এখনই মেরে ফেলব। এরপর বের হয়ে ওয়াসিমকে কিল-ঘুষি মারেন এবং তার স্ত্রীকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেন। তারা মারধর করে ওয়াসিমকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যান। তার স্ত্রী, স্থানীয় জনতা এবং পাশে ডিউটিরত ধানমন্ডির ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে উদ্ধার করে আনোয়ার খান মডেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
এই ঘটনার পর সোমবার কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ইয়াবা, অস্ত্র ও অবৈধ ওয়াকিটকি। পরে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম ইরফান সেলিমকে মাদক সেবনের দায়ে এক বছর এবং অবৈধভাবে ওয়াকিটকি ব্যবহার করায় ছয় মাস কারাদণ্ড দেন। এছাড়া ইরফানের দেহরক্ষী জাহিদুল ইসলামকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সোমবার রাতে ইরফান সেলিমকে কারাগারে পাঠায় র্যাব।
এদিকে, নৌবাহিনীর কর্মকর্তার দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় ইরফানের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। আগামীকাল বুধবার এ ব্যাপারে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
