হতভাগ্য স্বামীর কাঁধে ভর করেই চিরশায়িত ফাহমিদা

হাসপাতালেন বেডে বিয়ে করা সেই প্রেমিক স্বামীর কাঁধে ভর করেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন প্রেমিকা ফাহমিদা কামাল।

সোমবার বিকেলে (বাদ আছর) চট্টগ্রাম বাকলিয়ার চর চাক্তাই নতুন মসজিদ প্রাঙ্গণে ফাহমিদার নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর পর সেখানে পারবারিক কবরস্থানেই শায়িত করা হয় তাকে।

জানা গেছে, সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল সেন্টারে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান ফাহমিদা কামাল।

ফাহমিদাকে যখন মাহমুদুল হাসান কাঁধে তুলেন তখন জানাজায় অংশগ্রহণকারী লোকজন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, সবার মাঝে পিনপতন নিরবতা চলে আসে। চোখে পানি আসে সবার। অবশেষে সেই প্রিয়তমাকে নিজ কাঁধেই নিয়ে চিরশায়িত করে আসেন মাহমুদুল হাসান।

এর আগে ৯ মার্চ একই হাসপাতালের বেডে দীর্ঘদিনের প্রেমিক মাহমুদুল হাসানকে বিয়ে করেছিলেন ফাহমিদা। বিয়ের পরে ফাহমিদা কামাল ও মাহমুদুল হাসানের ক্ষণস্থায়ী সংসারজীবন কেটেছে হাসপাতালেই। বিয়ের পর মানসিকভাবে অনেক প্রাণবন্ত ছিলেন ফাহমিদা। বিয়েকে কেন্দ্র করে উৎফুল্ল ছিলেন তিনি, যার রেশ ছিল হাসপাতালের আইসিইউতে যাওয়ার আগেও।

ফাহমিদার চাচা ইউসুফ আলী বলেন, বিয়ের পরে মোটামুটি উৎফুল্ল ছিল মেয়েটি। প্রেশার কমে গেলেও, তার মনের জোর ছিল দুর্দান্ত। শরীরে বাসা বাঁধা ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে। নাকে অক্সিজেনের নল ও হাতে একগাদা সুই নিয়েও হাসিমুখে কথা বলত সবার সঙ্গে।

বিয়ের পর থেকেই ফাহমিদার পাশে থেকে সেবা করে গেছেন তার স্বামী মাহমুদুল হাসান। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও স্ত্রীর শয্যাপাশে ছিলেন মাহমুদুল।

তিনি বলেন, ‘ফাহমিদার মৃত্যুর পর শোকে মুহ্যমান স্বামী মাহমুদুল হাসান। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে যেন ডানাহারা হয়ে গেছেন তিনি। ভালোবাসার মানুষটি অল্প কদিন বাঁচবেন জেনেও কেবল মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে ফাহমিদার পাশে থাকার ইচ্ছা থেকেই বিয়ে করেন তিনি।

‘বিয়ের পর থেকে প্রতিদিন ফাহমিদার সেবাযত্ন করতেন। মৃত্যুর আগে শাশুড়ির আদর ভালোবাসাও পেয়েছেন ফাহমিদা। ক্ষণিকের সংসারজীবনে সবার ভালোবাসার মধ্যমণি হয়ে ছিল আমাদের মেয়ে ফাহমিদা।’

মাহমুদুল হাসান বলেন, আমি ফাহমিদাকে অনেক ভালোবাসি। এজন্য জীবনসঙ্গী করেছিলাম। চেয়েছিলাম ভালোবাসা দিয়ে মরণব্যাধি ক্যানসারকে জয়ী করবো। কিন্তু পারলাম না। আমাকে একা করে চলে গেলো। এত অল্প সময়ের মধ্যে তাকে হারাতে হবে ভাবিনি। তার আরও বাঁচার স্বপ্ন ছিল।’

ফাহমিদা কামাল (২৫) চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ বাকলিয়া এলাকার ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন ও শিউলি আক্তারের সন্তান। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন ফাহমিদা। তিনি আইইউবি থেকে এমবিএ করেছেন। তার স্বামী মাহমুদুল হাসান (৩০) কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাসিয়াখালীর সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুল হকের ছেলে।

ফাহমিদার পরিবার জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ফাহমিদা ও মাহমুদুলের পরিচয়। একসময় প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান দুজন। পরে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানে ব্যাঘাত ঘটায় মরণব্যাধি ক্যানসার। সবকিছু জেনেও ফাহমিদাকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন মাহমুদুল।

গত ৫ মার্চ ভারতের টাটা হাসপাতাল থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় ফাহমিদাকে। তখন চিকিৎসকরা বলেছিলেন, সর্বোচ্চ ৭ দিন হয়তো বাঁচতে পারেন তিনি। কিন্তু সেই শঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করেন ফাহমিদা।

ফাহমিদার আত্মীয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন সাকী বলেন, ‘বিয়ের সময় ফাহমিদা মুমূর্ষু ছিল। নাকে অক্সিজেনের নল নিয়ে বধূ সাজে। লাল বেনারসিতে হাসিখুশি ছিল বেশ।

‘এরপর ১১ দিন কেটেছে। এতেই বোঝা যায় মনের যুদ্ধে এগিয়ে ছিল ফাহমিদা। শক্ত মনোবল ছিল বলেই আল্লাহ তার হায়াত বৃদ্ধি করেছিল। অথচ চিকিৎসকরা বলেছিল, তার আগেই সে আমাদের ছেড়ে যাবে। শরীর হারলেও হারেনি তার মন। ভালোবাসার শক্তিই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল এতদিন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *