আজমেরি হক বাঁধন। এই অভিনেত্রীর এখন বলার মতো অনেক গল্প কিংবা তাকে নিয়েই এখন অনেক গল্প। তার সাফল্যের পেছনে রয়েছে হাসি, কান্না, আনন্দ-বেদনা। কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে জায়গা পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও আলোচিত বাঁধন।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম চলচ্চিত্র উৎসব ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব কেরালা’। গেল শুক্রবার (১৮ মার্চ) বাঁধন অভিনীত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দিয়েই এই আয়োজনের ২৬তম আসর শুরু হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এই অভিনেত্রী। আগামী ২৬ মার্চ বাঁধন দেশে ফিরবেন বলে জানান।
কেরালা থেকে মুঠোফোনে আজমেরি হক বাঁধন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা আমার জীবনের অন্যতম সুখকর অভিজ্ঞতা। এখানকার দর্শকের আমি বলব ম্যাজিক্যাল। আর্ট কালচারের প্রতি তাদের সম্মান প্রদর্শন দেখে আমি অবাক! এর আগেও রেহানা নিয়ে আমি বিশে^র অনেক বড় বড় জায়গায় গেছি। কিন্তু কেরালার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম। একটি ওপেন এয়ার অডিটটোরিয়ামে তিন হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা। নিখুঁত সাউন্ড সিস্টেম আর টেকনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট। রেহানা এতোবার ছবিটি দেখলেও এবারই যেন প্রথম ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো এতো নিখুঁতভাবে শুনলাম।
হাজার হাজার দর্শক ছবিটি দেখেছেন। কিন্তু শো চলাকালে যেন পিনপতন নীরবতা ছিল। একজন দর্শকও উঠে চলে যাচ্ছে না, ফোন দেখছে না কিংবা পাশের জনের সঙ্গে কথা বলছে না। সবাই যেন সিনেমাতে বুঁদ ছিল। এমন দর্শকের জন্যই তো সাউথ ইন্ডিয়ার সিনেমা আজ এত ভালো অবস্থানে। তারা সেখানকার আর্টিস্টদের যে কীভাবে সম্মান করে তা না দেখলে বোঝা যাবে না। আমাকে তো সেখানকার কেউ চেনে না। তারপরও যে আন্তরিকতা ও সম্মান তারা দেখিয়েছে, যা আমার পুঁজি হয়ে সঙ্গে ফিরবে। আমি আসলে অত্যন্ত ভাগ্যবতী যে এ ধরনের অভিজ্ঞতা এক জীবনে লাভ করলাম।’
গেল ফেব্রুয়ারি মাসেই বাঁধন শেষ করেছেন বলিউডের নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজের ‘খুফিয়া’ সিনেমার শুটিং। খুব শিগগিরই ছবিটি মুক্তি পাবে বলেও জানান তিনি। মুম্বাইতে কাজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বাঁধন বলেন, ‘বলিউডে কাজের অভিজ্ঞতা আমি বলবো এক কথায় অসাধারণ। তারা শিল্পীকে সম্মান দিতে জানে, যেটা আমাদের দেশে নেই। ছবিটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছেন টাবু, সেখানে আমার একটা ছোট্ট চরিত্র। কিন্তু তারপরেও তারা আমাকে যথেষ্ঠ সম্মান দেখিয়েছেন। বিশাল ভরদ্বাজ তার টিমকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাঁধন এখানের অতিথি, তার যেন কোনরকম অসুবিধা না হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা অনেক বেশি গোছানো এবং আগে থেকেই সবকিছু সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে রাখে। সময়ের বিষয়েও তারা ভীষণ সতর্ক। টেকনিক্যালি তো তারা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, হওয়াটাও স্বাভাবিক; কারণ তাদের বাজেটও থাকে অনেক বেশি। আরও একটা মজার বিষয় হলো, তাদের প্রতিটা ডিপার্টমেন্টেই অনেক মেয়ে কাজ করে, সেটা কস্টিউম হোক বা লাইটে হোক কিংবা আর্টে হোক; সব বিভাগেই মেয়েরা স্বাধীনভাবে কাজ করে। প্রতিটা শিল্পীকে তারা উপযুক্ত সম্মান করে। কে বড় চরিত্র করছে কিংবা কে ছোট চরিত্র করছে; এভাবে তারা বিভাজন তৈরি করে না। কিন্তু আমাদের দেশে এ বিভাজনটা আছে।’
‘তারা অবস্থা কিংবা অবস্থান দেখে এই সম্মান করছেন না। আমি একজন শিল্পী আর শিল্পী মানেই সম্মানের। তারা সেটার কদর করতে জানে এবং করেও। যেটা অন্য কোথাও তেমন নেই। আমি কলকাতাতেও কাজ করেছি কিন্তু সেখানেও অভিজ্ঞতা অনেকটা তিক্ত বলা যায়। টিম থেকে উল্লেখযোগ্য সাপোর্ট পাইনি।’
তাহলে নিজ দেশেও এ সম্মানটা পাননি, এমনটাই বলতে চাচ্ছেন? এমন প্রশ্নে বাঁধনের স্পষ্ট উত্তর, ‘আমাদের দেশে তো কারও অবস্থা, অবস্থান কিংবা ক্ষমতা দেখে সম্মান করে। তা নাহলে উপযুক্ত সম্মানটা করতেই চান না অনেকে। এটা যে শুধু আমাদের মিডিয়াতে এমনটা না, আমাদের সমাজটাই এমন। অবস্থান আর ক্ষমতা দেখে সম্মান প্রদর্শন করে। সেটা না থাকলে কেউ সম্মান দেখাতে চান না। আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাইনি, আমি এটাই বলবো। যার অবস্থান ভালো কিংবা অনেক ক্ষমতা, তাকে সবাই প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সম্মান দেখান। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রেও তাই। একটা নতুন শিল্পীকেও অনেকেই সম্মান দেখাতে চান না। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারটা সবার পারিবারিক শিক্ষা হওয়া উচিত বলেই আমি মনে করি।’
