নজর২৪ ডেস্ক- বাজারের অন্যান্য কোম্পানির সাথে ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা করে কমদামে পণ্য, বিশেষত বিশাল ছাড়ে মোটরবাইক বিক্রির অফার দেওয়াই শেষপর্যন্ত ইভ্যালির জন্য কাল হয়েছে, যা কোম্পানির ব্যবসাকে পথে বসায় বলে পুলিশকে জানিয়েছেন ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী (সিইও) মোহাম্মদ রাসেল।
রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, মোটরসাইকেল কিনতে অগ্রিম টাকা খরচ করা এসব গ্রাহকদের একটা বড় অংশের লোকজনই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির।
গত তিন বছরে আর্থিক কেলেঙ্কারিতে যুক্ত প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রাহকরা প্রায় দুই লাখ মোটরসাইকেল অর্ডার করেন, যার বেশিরভাগই প্রতিষ্ঠানটি ডেলিভারি দিতে পারেনি।
জিজ্ঞাসাবাদে জড়িত ধানমন্ডি থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা এমনও গ্রাহক পেয়েছি যিনি মোটরসাইেকলই চালান না, অথচ প্রায় ১৬-১৭টি মোটরসাইকেল একজনের অ্যাকাউন্ট থেকেই অর্ডার করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে তিনি এগুলো ব্যবহার করতে অর্ডার করেননি, আমরা পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি এসব মোটরসাইকেলের বেশিরভাগই আবার শোরুমে কম দামে বিক্রি হয়ে যেত।”
তদন্তকারীরা বলেন, দেশে বিআরটিএ নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ছয় লাখের মতো। তবে, মাত্র তিন বছরে আরো প্রায় দুই লাখ মোটরসাইকেল শুধু ইভ্যালিতেই অর্ডার পড়েছে, যা দেশের মোটরবাইকের বাজারে বিরূপ প্রভাব তৈরি করে।
রাসেলের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে ব্যবসায় লাভ করতে ছাড়ের (ডিসকাউন্ট) পরিমাণ কমিয়ে আনছিলাম, তবে ধামাকা, ই-অরেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রাতারাতি অস্থির পরিবেশ তৈরি করে, যার কারণে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে।”
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রিমান্ড চলাকালে রাসেলের দেওয়া এসব তথ্য তারা ইভ্যালির সার্ভার থেকে পাওয়া তথ্যের সাথে যাচাই-বাছাই করে মিলিয়ে দেখছেন।
এদিকে, গত তিন বছরে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার পণ্য বা সেবা নিতে গ্রাহকরা ইভ্যালিতে অর্ডার-বুক করেছেন, যার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করতে পেরেছেন বলে পুলিশের কাছে দাবি করেছেন ইভ্যালি সিইও।
কিন্তু, এতে ১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় কোম্পানির আর্থিক দশা শোচনীয় হয়ে পরে। এরমধ্যে গ্রাহকদের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ও মার্চেন্টদের কাছে দেনা রয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বাবদ আরো ৫০ কোটি টাকার মতো দেনা আছে বলেও পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন রাসেল।
রাসেল আরও দাবি করেন, সাভারে গুদামের জন্য কয়েক শতাংশ জমি ছাড়া তার ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কোন সম্পদ নেই।
এমনকি তিনি মোহাম্মদপুরে ভাড়া অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন বলেও পুলিশের কাছে বলেছেন। বরবারই তিনি দেশের বাইরে টাকা পাচারের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
উল্লেখ্য, ২১ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি থানার প্রতারণার মামলায় মোহাম্মদ রাসেলের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। অন্যদিকে শামীমা নাসরিনের রিমান্ড ও জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে।
সেদিন গুলশান থানার প্রতারণার মামলায় তিনদিনের রিমান্ড শেষে তাদের ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এরপর ধানমন্ডি থানার প্রতারণার মামলায় তাদের সাতদিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করে পুলিশ।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলামের আদালতে তাদের হাজির করা হয়। এরপর গুলশান থানায় প্রতারণার অভিযোগে করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়াহিদুল ইসলাম।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মনিরুজ্জামান লিটন তাদের রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম তাদের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ইভ্যালি এমডি রাসেলের বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। অভিযান শেষে এ দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাদের র্যাব সদর দপ্তরে নেওয়া হয়। সেখানেই চলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ।
এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে আরিফ বাকের নামে ইভ্যালির এক গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও রাসেল এবং তার স্ত্রী (প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান) শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গুলশান থানায় মামলা করেন।
