৫ মিনিটে ৩ জনকে খুন করেন এএসআইঃ অবশেষে জানা গেল ঘটনার আদ্যোপান্ত

নজর২৪ ডেস্ক- খুনোখুনি কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে কুষ্টিয়া যা দেখেছে, তা বিরলই বলা চলে। নিজের স্ত্রী, যার আগের সংসারের বাচ্চাকে মেনে নিয়েই বিয়ে করেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, সেই তিনিই কী আক্রোশে স্ত্রী ও সন্তানকে ধরে এনে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করেছেন, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

 

খুনের অভিযোগ খুলনার ফুলতলা থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সৌমেনের বিরুদ্ধে। এই দুজনকে ছাড়াও হত্যা করা হয়েছে আরও একজনকে, যার সঙ্গে তার স্ত্রীর সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করছিলেন সৌমেন।

 

সৌমেন রায় পাঁচ বছর আগে বিয়ে করেন আসমা খাতুনকে। এটি সৌমেনের দ্বিতীয় বিয়ে হলেও আসমার তৃতীয়। আসমা এর আগে বিয়ে করেন সুজন ও রুবেল নামে দুজনকে। রুবেলের ঘরের সন্তান হলো রবিন।

 

আসমা খাতুন কুমারখালী উপজেলার যদবয়রা ইউনিয়নের ভবানীপুরের আমির উদ্দিনের মেয়ে। কিন্তু তিনি বড় হন তার নানিবাড়ি বাগুলাট ইউনিয়নের নাতুড়িয়ায়। সন্তান, মা ও ভাইকে নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

 

কুষ্টিয়া শহরের কাস্টমস মোড়ে বেলা ১১টার দিকে তিন খুনের ওই ঘটনা ঘটে।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আসমা তার শিশুসন্তানকে নিয়ে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের কাস্টম মোড়ে তিনতলা একটি ভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিকাশকর্মী শাকিলও। হঠাৎ সেখানে পৌঁছে সৌমেন পিস্তল বের করে আসমার মাথায় গুলি করেন। পাশে থাকা শাকিলের মাথায়ও গুলি করেন তিনি। আসমার ছেলে রবিন পালাতে গেলে তাকে ধরে মাথায় গুলি করা হয়।

 

এ সময় আশপাশের লোকজন সৌমেনকে ধরতে গেলে তিনি দৌড়ে তিনতলা ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন। পরে লোকজন ভবনটি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন।

 

একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সৌমেনকে গ্রেপ্তার করে। গুলিবিদ্ধদের উদ্ধার করে পাঠানো হয় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

 

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) খায়রুল আলম সাংবাদিকদের জানান, শাকিলের সঙ্গে আসমার বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হত্যায় ব্যবহৃত পিস্তলটি জব্দ করা হয়েছে।

 

মেয়েকে গুলি করে হত্যার খবর শুনে কুষ্টিয়া হাসপাতালে আসেন মা হাসিনা খাতুন। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে এএসআই সৌমেন আসমাকে নির্যাতন করে আসছেন। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খাইরুল আলম আসমাকে সৌমেনের সাবেক স্ত্রী বললেও মা হাসিনা খাতুন বলেন, ‘তাদের এখনও ছাড়াছাড়ি হয়নি।

 

‘রোববার সকালে এসে সৌমেন তার স্ত্রী ও সন্তানকে খুলনা নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। পরে জানতে পারি তিনি তাদের গুলি করে মেরেছেন।’

 

মরদেহের পাশে কাঁদছিলেন আসমার ভাই হাসান। শাকিলের সঙ্গে আসমার সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, আসমার সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে সম্পর্ক হয়। তারা বন্ধু ছিলেন। শাকিলের বাড়ি কুমারখালীর শাওতা গ্রামে।

 

কাঁদতে কাঁদতে শাকিলের বোন লিপি খাতুন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের কী দোষ? আরেকজনের ওপর রাগ করে তকে মেরে ফেলল।’

 

এএসআই সৌমেনের বাড়ি মাগুরার শালিখা উপজেলার কসবা গ্রামে। খুলনায় তিনি প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে থাকেন।

 

এদিকে পুরো ঘটনাটি মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ঘটে বলে জানিয়েছেন ওই স্থানের দোকানদার মাসুদ সরদার।

 

তিনি জানান, কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের কাস্টমস মোড় থেকে নেমে আসা ম আ রহিম সড়কের প্রথম বাড়ি নাজ ম্যানশন। এর বিপরীত দিকে প্রথম দোকানটি তার।

 

মাসুদ বলেন, ‘বেলা সোয়া ১১টার দিকে হবে, আমি তখন দোকানে কলা সাজাচ্ছিলাম। দেখলাম রাস্তার ওপারে দুজন পুরুষ, একজন মহিলা ও এক শিশু দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তারা সামনের খাবারের দোকানে বসতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দোকানি তাদের না করে দেন।

 

‘এরপর তারা কথা বলতে বলতে ওই বিল্ডিংয়ের (নাজ ম্যানশন) নিচতলার কলাপসিবল গেটের ভেতরে চলে যান। সেখানেও দুই সারিতে দোকান রয়েছে। হঠাৎ তিনটি গুলির শব্দ শুনি। শুনি চিৎকার-চেঁচামেচি।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘এর মধ্যে দেখি ওই শিশুটি দৌড়ে বের হয়ে আসল। সে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে পেছনে পিস্তল হাতে ছুটে আসেন একজন।

 

‘তিনি শিশুটির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর তিনটি গুলি করেন। এরপর আবার দ্রুত কলাপসিবল গেটের মধ্যে চলে যান।’

 

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী রাসেল বলেন, ‘আমি বসেছিলাম ঘটনাস্থলের খুব কাছে রাস্তার ওপারে একটি দোকানে। গুলির শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে সামনে আসলাম। দেখি একটা বাচ্চা দৌড় মারছে। একজন এসে বাচ্চাকে তিনটা গুলি করল।

 

‘আমরা বাচ্চাটাকে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করছিলাম। ওই সময় লোকটি আমাদের দিকেও একটি গুলি করল। গুলিটি আমাদের কারও গায়ে লাগেনি। পরে আমরা বাচ্চাটিকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলাম।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘পরে লোকটি কলাপসিবলের ভেতরে গিয়ে আরও ৩-৪টি গুলি করল। আমরা দূর থেকে দেখলাম ভেতরে একজন মহিলা এবং একজন পুরুষ নিচে পড়ে আছে।’

 

দোকানি মাসুদ সরদার জানান, ‘এ ঘটনা ৫ মিনিটের মধ্যেই ঘটে। পরে জড়ো হওয়া লোকজন ওই লোক এবং বাসাটিকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় একটি কাচের বোতল তার মাথায় লাগলে বলেন, আমি নিজেই পুলিশ ডেকে ধরা দেব। আপনারা ইট মারবেন না। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ আসলে তিনি পিস্তল নিচে ফেলে আত্মসমর্পণ করেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *