হঠাৎ ‘গরম’ থেকে ‘নরম’ হেফাজত

নজর২৪ ডেস্ক- ২৫ মার্চ। বায়তুল মোকাররমের সামনের সমাবেশে বক্তা হেফাজত নেতা মামুনুল হক। বক্তব্যের ভাষা বেশ আক্রমণাত্মক। বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির আগমনই হবে সরকারের পতনের ক্ষেত্র৷ যদি সরকার আমাদের দাবি না মানে।’

 

২৭ মার্চ। পরদিনের হরতালকে সামনে রেখে আবার বায়তুল মোকাররমের সামনে হেফাজতের সমাবেশ। এবার একই ধরনের বক্তব্য কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ফজলুল করিম কাসেমীর। বলেন, ‘হরতালে বাধা দিলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে।’

 

৩১ মার্চ। হরতালে তাণ্ডবের প্রতিবাদে ১১ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তুলাধুনা করে হেফাজতের বিবৃতি। বক্তব্য, ‘আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসী ভারতের করদরাজ্যে পরিণত করার চক্রান্ত আমরা গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলে নস্যাৎ করে দিব, ইনশা আল্লাহ।… কোনো অপশক্তির হুমকি-ধমকিকে নায়েবে রাসূল ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদি জনতা পরোয়া করে না।’

 

২ এপ্রিল। বায়তুল মোকাররমে হেফাজতের সমাবেশ। মামুনুল বললেন, ‘সাবধান হয়ে যান আমাদের ভাইদের একজনকেও আর গ্রেপ্তার করবেন না। /মামলা প্রত্যাহার করুন তাদেরকে গ্রেপ্তার করেছেন তাদের মধ্যে দিয়ে।’

 

৭ এপ্রিল। জাতীয় সংসদে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় হেফাজতের বিবৃতি। ‘আমরা কোনো ধরনের রক্তচক্ষুকে পরোয়া করি না। কোনো সংঘাত চাই না। কিন্তু আমাদের উসকানি দিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তার পরিণতি সরকারের জন্য ভালো হবে না।’

 

পর দিন আবার হেফাজতের আমির জুনাইদ বাবুনগরীর নামে গণমাধ্যমে বিবৃতি। বক্তব্য ‘হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন। কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানো কিংবা কাউকে ক্ষমতায় বসানো হেফাজতের কাজ নয়। আমরা শান্তিপ্রিয় এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে।’

 

গত কয়েক মাস ধরে সভা সমাবেশে, ওয়াজে হুমকি ধমকি দিয়ে আসা কওমি মাদ্রাসাকেন্ত্রিক সংগঠনটি মার্চের শেষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে ঘিরে ব্যাপক সন্ত্রাস চালায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রয়্যাল রিসোর্টে নারী নিয়ে মামুনুল হক অবরুদ্ধ হওয়ার পর তাকে উদ্ধার করতে গিয়েও তাণ্ডব চালায় হেফাজত কর্মীরা।

 

সোনারগাঁ তো বটেই মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া, সুনামগঞ্জের ছাতকেও ত্রাস তৈরি করে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। সেই সঙ্গে অনলাইনে বিশেষ করে ফেসবুক লাইভে এসে চলতে থাকে হুমকি ধমকি।

 

তবে এবার সরকারপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সতর্ক করে দিয়ে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি সহিংসতার ঘটনায় গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়েছে, তখন হেফাজতের বক্তব্যও নরম হয়েছে। বাবুনগরীর শেষ বিবৃতিতে কোনো ধরনের হুমকি নেই বরং জনগণের মনের প্রতিক্রিয়ার সতর্কতা দেয়া হয়েছে।

 

হেফাজতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে এতে বলা হয়েছে, ‘অন্যথায় আলেম-ওলামার সঙ্গে বাড়াবাড়ির কারণে সরকার নিঃসন্দেহে জনগণের কাছে আরও ঘৃণিত ও নিন্দিত হবে।’

 

নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে এলে ‘সরকার পতনের ক্ষেত্র তৈরি করার’ ঘোষণা দেয়ার পর ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ত্রাস চালায় হেফাজত। আক্রমণ হয় বহু সরকারি সম্পত্তি এমনকি থানায়।

 

দুই দিন পর হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তাণ্ডব ছিল নজিরবিহীন। সরকারি বেসরকারি স্থাপনার পাশাপাশি সেখানে হামলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের যতগুলো স্মৃতিচিহ্ন ছিল, ততগুলোতে। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জে থানা, আওয়ামী লীগ অফিস, মহাসড়কে চলেছে তাণ্ডব।

 

তবে এখন কিছুই স্বীকার করে না হেফাজত। সংগঠনের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নোমান ফয়েজী ​বলেন, ‘আসলে আমরা সরকারকে কোনো হুমকি দেইনি। এখানে বোঝার ভুল আছে, যা আমাদের আমির স্পষ্ট করে বলেছেন। আমরা কারও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করি না, কারও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ারও হই না। কোনো রাজনৈতিক ফাঁদে আমরা পা দেব না। এ কারণে দেশের বিরোধী জোটগুলো বিভিন্ন সময়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও লাভবান হয়নি।’

 

তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিষ্কার কথা, অদূর ভবিষ্যতেও হেফাজতে ইসলাম কারও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করবে না। আর সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের কর্মসূচি ছিল বলে যেটা বলা হচ্ছে, এটাও ঠিক না।’

 

‘উত্তপ্ত’ থেকে ‘শীতল’ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ফজলুল করিম কাশেমী বলেন, ‘এখন লকডাউনের বিষয়টি সামনে চলে আসছে। আমাদের কর্মীরাও অনেকে আহত, প্রতিদিনই কিছু কিছু গ্রেপ্তার হচ্ছে। এ বিষয়গুলো আমরা আগে দেখছি। আমরা সরকারের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার দিকে যাচ্ছি না। তার আসলে প্রয়োজনও নেই।’

 

বাবুনগরীর বক্তব্য প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সরকারের পতন ঘটানো আমাদের কাজ না। তবে হয়ত কেউ কেউ গরম কথা বলে থাকতে পারেন। কিন্তু আমাদের সংগঠনের আমির যে কথা বলেছেন, সেটাই বাস্তব কথা।’

 

তাহলে হরতালের মতো কর্মসূচি কেন দিয়েছিলেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর হাটহাজারী ও ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় জুলুম হয়েছে তাই আমরা এমন কর্মসূচি দিয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *