মামুনুল হককে ছাড়াই শেষ হলো মাহফিল, ক্ষোভ ঝাড়লেন বাবুনগরী

নজর২৪ ডেস্ক- দিনভর উত্তেজনা ও নানা আলোচনার পর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বয়ান করতে পারেননি খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক।

 

শুক্রবার সন্ধ্যায় হাটহাজারীর পার্বতী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘আল আমিন সংস্থা’ আয়োজিত বার্ষিক মাহফিলের অন্যতম বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল তার, শেষ পর্যন্ত মামুনুল হককে ছাড়াই মাহফিল শেষ হয়।

 

এদিন মাগরিবের নামাজের পর হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাটহাজারী পার্বতী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসে পৌঁছান।

 

এ সময় মাওলানা মামুনুল হকের কুশপুত্তলিকা দাহ করায় ক্ষোভ জানিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, ‘বোলার বাত ডিল ন মারিস’। ওস্তাদেরকে বেইজ্জতি করলে মাদ্রাসার ছাত্ররা বসে থাকতে পারে না।

 

দীর্ঘ বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, “সরকার প্রশাসনকে আমরা সম্মান করি, ইজ্জত করি, গোয়েন্দারা এখানে আছেন। কিন্তু কোনো হক কথা আমরা ছাড়ব না।

 

“মামুনুল হক শায়খুল হাদীস। উনার পিতা একজন শায়খুল হাদীস। উনার (মামুনুল) আসার কথা ছিল। সরকার-প্রশাসনের লোকজন আমাদের সাথে আলাপ করেছেন। আমরা শান্তি চাই।”

 

সেই সঙ্গে মামুনুলকে ঠেকানোর আন্দোলন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হেফাজত আমির বলেন, “একজন আলেমকে এভাবে অপমান করলে… মাননীয় প্রশাসন, এগুলোর দ্বারা আপনাদেরই সমস্যা হবে।”

 

জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, আজকের মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে মাওলানা মামুনুল হক হাটহাজারী আসলেও প্রশাসনের অনুরোধে মাহফিলে বক্তব্য না দিয়েই ঢাকায় ফিরে গেছেন। উনি (মামুনুল) বলেছেন, ‘আমি ছাড়াও মাহফিল হবে। আমি যাব না।’ এটা ছাড়া উনার হাজারো মাহফিল আছে। মামুনুল হক আর আসেননি। উনি আসার জন্য আগ্রহী নন। নিজেই ফিরে গেছেন। বয়ান করবেন না। যেখানে বিশৃঙ্খলা, সেখানে আমরা নেই। হেফাজতের উদ্দেশ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

 

মামুনুলকে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে যারা রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন, তাদের সমালোচনা করে হেফাজত আমির বলেন, “চলে গেছেন, খালাস। সে তো আসতেছে না। কিন্তু কিছু উগ্রপন্থি তার ছবিতে আগুন দেওয়ার কারণ কী।

 

“প্রশাসন আমার সাথে পরামর্শ করে, কথা বলে, সব জানে… তাহলে কেন? তাহলে এসব জুলুম নির্যাতন কেন করা হল।”

 

মামুনুল হকের ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘অশালীন’ প্রচারের অভিযোগ করেন বাবুনগরী। যারা এসব করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে তিনি বলেন, “আইন আমরা হাতে নেব না। আইন থাকবে সরকার প্রশাসনের কাছে। দাবি করছি, এসব কুচক্রি মহলের কারণে আপনাদেরও ক্ষতি।”

 

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মামুনুল হক সদ্য ঘোষিত হেফাজতে ইসলামের কমিটিতে যুগ্ম মহাসচিবের পদ পেয়েছেন।

 

নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে রাজধানীর ধোলাইরপাড়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি তোলেন এই হেফাজত নেতা।

 

এ ঘটনায় মামুনুল হককে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) একাধিক স্থানে বিক্ষোভ করেন চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা।

 

এর মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক হাটহাজারীতে এসে পার্বতী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আল আমিন সংস্থার আয়োজিত তাফসীরুল কোরআন মাহফিলে উপস্থিত হচ্ছেন, এই খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মাহফিলে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হননি।

 

যদিও এরআগেই মধ্যরাতে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) ভোরবেলা চট্টগ্রামে এসে পৌঁছান হেফাজত ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। এরপর হাটহাজারী মাদ্রাসায় গেলেও শেষ পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত মাহফিলে যোগ দেননি মামুনুল হক। মাহফিলে যোগ না দিয়েই ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। মামুনুল হকের সহকর্মীর বর্ণনায় উঠে এসেছে এর আদ্যোপান্ত।

 

জানা যায়, মামুনুল হক সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা ‘রাহমানী পয়গাম’-এর সহকারী সম্পাদক এহসানুল হক চট্টগ্রামে আসার পথে হেফাজত ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের সফরসঙ্গী ছিলেন।

 

পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘মামুন সাহেবের মাহফিল বেশ কিছুদিন ধরে বাতিল হচ্ছে। এরপরও অঘোষিতভাবে তিনি কিছু মাহফিলে অংশ নিয়েছিলেন। অনেক কারণেই আল আমিন সংস্থার মাহফিলটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রশাসন বাধা দেবে— এটা জানা কথা। সন্ধ্যার পর থেকেই প্রশাসন থেকে বিভিন্ন রকম ফোন আসতে থাকলো। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সমাবেশের ভাষণগুলো মামুন সাহেব দেখলেন।’

 

‘আমি জিজ্ঞেস করলাম (মামুনুল হককে) এই রিস্কের মধ্যে যাবেন? তিনি বলেন, অবশ্যই যাবো। তিনি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সিদ্ধান্ত নিলেন রাতেই রওনা হয়ে যাবেন।

 

তিনি তখন নানাজান শাইখুল হাদীস রহ. এর কথা স্মরণ করে বলছিলেন, আব্বাকে নিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতিতে কত পড়েছি। এমন উৎকন্ঠায় কত সময় পার করেছি। এক পথে বাধা এসেছে, আরেক পথে গিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি। আমার বিরুদ্ধে এত জলদি এসব শুরু হয়ে গেলো!’

 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুরুর দিকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তখনও বিভিন্ন মহল থেকে ফোন ও ম্যাসেজ অব্যাহতভাবে আসছেই। তবুও তিনি অটল। হাটহাজারীর পথে রওনা হবেন। এশার নামাজ পড়লাম।

 

হালকা খাবার খেয়ে তিনি যখন গাড়িতে উঠবেন— আমাদের কেউ বললেন, সফর তো দুই দিনের? তিনি বললেন, না, সফর রাতেও শেষ হয়ে যেতে পারে। আবার দুইদিনও লাগতে পারে। আর যদি আল্লাহ কবুল করে ফেলেন তাহলে তো হলোই। এই কথা বলে আল্লাহর নাম নিয়ে যাত্রা করলেন হাটহাজারীর পথে।’

ঢাকা থেকে ভোরবেলা মামুনুল হকের চট্টগ্রামে পৌঁছার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভোরে তিনি চট্টগ্রাম পৌছান। ততোক্ষণে আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে চলে আসার বার্তা আসতে থাকলো। সর্বশেষ আমাদের নিজেদের মহল ও সিনিয়র নেতৃবৃন্দ থেকেও পরামর্শ আসলো— মাহফিলে যোগ না দিলেই ভালো হয়।

 

একটা মাহফিলের জন্য এভাবে সংঘাতে জড়ানো ঠিক হবে না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশংকা আছে। মুরুব্বিদের পক্ষ থেকে এই কথা সামনে আসার পর আর কিছু করার ছিলে না। তিনি মাহফিলে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এবং ঢাকার পথে রওনা হন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *