নজর২৪, ঢাকা- হেফাজতে ইসলামের উগ্রবাদী ও পাকিস্তানপন্থী অংশ নেতৃত্বে রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান।
রোববার (২২ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
জিয়াউল হাসান বলেন, ‘এখনকার যে হেফাজত, এ হেফাজতের উগ্রপন্থী, পাকিস্তানপন্থী, তালবানপন্থী, জঙ্গি এবং প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী অংশ এখন নেতৃত্বে আসছে।’
তিনি বলেন, ‘ভাস্কর্য এবং প্রতিমা পূজা মূর্তি এক জিনিস নয়।…. মূর্তি ও ভাস্কর্য শব্দের অর্থকে ভুল ব্যখ্যা করে মাঠ গরম করার চেষ্টা করবেন না। কারণ এ দেশের মানুষ আপনাদেরকে ৭১ সালেও চিনতে ভুল করে নাই, এখনো করবেনা।
১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মিত শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং সাত জন বীরশ্রেষ্ঠের নামে স্থাপিত স্মৃতি ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে বাংলাদেশের কোন মুসলমান একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৬ ই ডিসেম্বর, ২৬ শে মার্চ যখন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তখন তারা কেউ সেখানে বোখারী এবং মুসলিম হাদিস ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়্যাত এর শিক্ষা অনুযায়ী ইবাদতের নিয়তে, প্রার্থনা করার নিয়তে আমরা কেউই স্মৃতিসৌধে এবং ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করি না।’
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভাস্কর্য রয়েছে উল্লেখ করে ধর্মীয় এই নেতা আরও বলেন, ‘কট্টর ওয়াহাবীপন্থী হুজুররাও এটি জানে, প্রাণীর ভাস্কর্য মানেই শিরক নয়। সৌদি আরবে জেদ্দার মূল কেন্দ্রে দি ফিস্ট নামে একটি ভাস্কর্য আছে, এটি একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভাস্কর্য। আরও আছে ঘোড়ার ও মাছের ভাস্কর্য। একইভাবে মুসলিম অধ্যুষিত দুবাই, ইরান ইন্দোনেশিয়া ও মিশরে রয়েছে ঘোড়া ও অন্যান্য জীবের ভাস্কর্য। প্রমাণিত হল ভাস্কর্য জীব দেহের হোক বা জীব দেহের কোন অংশের হোক তা যদি শিরক বা পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত না হয় তবে এতে কোন বারণ নেই।’
চরমোনাই পীর ও হেফাজতের নেতার সমালোচনা করে এ নেতা বলেন, ‘মূর্তি ও ভাস্কর্য যে উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে সেই উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবে এটি বৈধ নাকি অবৈধ। লোকেরা বলাবলি করছেন এই কথা বলে যে, চরমোনাই পীর সাহেবের নির্বাচনী মার্কা হাত পাখা আজ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হাতপাখা যা বিলুপ্ত প্রায়, হাতপাখার কিছু ভাস্কর্য নির্মাণ করে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হোক!
চরমোনাই পীর মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং হেফাজতের নেতা মামুনুল হককে আমরা বলবো আপনাদের দেশবিরোধী এই সকল আন্দোলন বাস্তবায়নের জন্য জনগণের মেন্ডেট নি সংসদে গিয়ে বিল উত্থাপন করে সংখ্যা গরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের সমর্থন নিয়ে আপনাদের বাপ-দাদাদের আমলে নির্মিত এ সকল ভাস্কর্য-মূর্তিপূজা বন্ধ করার আইন পাস করতে পারেন কিনা তা চেষ্টা করে দেখুন।’
মসজিদকেন্দ্রিক রাজনীতি বন্ধ করার দাবি জানিয়ে ইসলামী জোটের সভাপতি বলেন, ‘মসজিদ আল্লাহর ঘর, এর পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের সকলের কর্তব্য। মসজিদে নোংরা রাজনীতি, কূটনীতি, মিছিল, আন্দোলন, ককটেল, বোমা, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে পুলিশের ওপর আক্রমণ করা, পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে মারধর করা, ইট-পাথর নিক্ষেপ করা কোনো ধার্মিকের কাজ হতে পারে না।
একই কথা মাদ্রার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অবিলম্বে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি চালার সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং জামাত-শিবির হেফাজতি চক্রসহ জঙ্গি মদদ দাতা, ধর্ম ব্যবসায়ী সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও তার চত্ত্বরে নিষিদ্ধ করার জন্য আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই।’
ইসলামী জোটের সভাপতি বলেন, ‘ধর্মের নাম নিয়ে সরল মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং গুজব রটিয়ে তাদের রাজপথে নামিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা ধার্মিকতার লক্ষণ নয়। এ ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে যেকোনও সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। তাছাড়া মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না, কারণ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে (ইতিপূর্বে) অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।”’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারকে বলবো, এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায়, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশের শিক্ষাবিদ ও দেশপ্রেমিক ইসলামি চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে একটি “জাতীয় শিক্ষা কমিশন” গঠন করে বিজ্ঞানভিত্তিক এককেন্দ্রিক, গণমুখী, অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা চালু করা, জাতীয় চিন্তা-চেতনায় সব শিক্ষার্থীকে এক-অভিন্ন মনস্কে গড়ে তোলা। বিশ্বায়নের সামগ্রীক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যোগ্য নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন—জোটের সহ-সভাপতি মুফতি জোবাইদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ আব্দুস সোবহান মিয়া, সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাওলানা আবুল হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মোসলেহ উদ্দিন ফোরকান, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক অধ্যক্ষ মাওলানা ফারুক হোসাইন, মুফতি মাওলানা শরীফ হোসাইন প্রমুখ।
