বাংলা সঙ্গীতাঙ্গণের এক উজ্জল নক্ষত্রের নাম রুমানা মোর্শেদ কনক চাঁপা। অসংখ্য গান গেয়ে মানুষের মন জয় করে আছেন তিনি। গতকাল ১১ সেপ্টেম্বর প্রথিতযশা এ কণ্ঠশিল্পীর জন্মদিন। রাত ১২টার পর থেকেই জন্মদিনে শুভেচ্ছায় ভাসছেন কনকচাঁপা।
১৯৬৯ সালের এই দিনে ঢাকার শান্তিবাগে জন্ম কনকচাঁপার। তার দাদার বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে। তবে কনকচাঁপার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তার বাবার নাম আজিজুল হক মোর্শেদ। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে কনকচাঁপা তৃতীয়।
অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে তিনি বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। চলচ্চিত্র, আধুনিক গান, নজরুল সঙ্গীত, লোকগীতিসহ সবধরনের গানে কনকচাঁপা সমান পারদর্শী।
তিনি ৩৩ বছর ধরে সংগীতাঙ্গণে কাজ করে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের তিন হাজারেরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন কনকচাঁপা। তার প্রকাশিত একক গানের অ্যালবাম সংখ্যা ৩৫।
বিশেষ দিনে তিনি মনের জানালা খুলে কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। গানের পাশাপাশি উঠে এসেছে তার একান্ত ইচ্ছে, ভাবনা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা-
জন্মদিন এলে কী মনে হয়, বয়স বাড়ে নাকি কমে? জানতে চাইলে কনকচাঁপা বলেন, বয়স একদিকে বাড়ে, আরেকদিকে আয়ু কমে। তবে এটাকে আমি অন্যভাবে দেখি। গত বছর আমার বয়স ছিলো ৫২, এবার ৫৩-তে পা দিলাম। সে হিসেবে আমার এক বছরের অভিজ্ঞতা বাড়লো। এই অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনে বড় অর্জন। এ কারণেই কিন্তু আমরা আমাদের বয়োবৃদ্ধদের সম্মান করি, কেননা তাঁরা অনেক কিছুর সাক্ষী। জন্মের পর থেকেই এক এক করে বছর যাচ্ছে, একইসঙ্গে আমি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, জীবনের অনেক রঙ-রূপ দেখেছি। তাই আমার অনুভূতি হলো- বয়স বাড়ে না, কমেও না; শুধু অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারি হয়।
এমন কোনও কাজ আছে, যেটা এখনও করতে পারেননি। যার জন্য আক্ষেপ হয়…
কনকচাঁপা বলেন, আমি একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক হতে চাই। কিন্তু সেটা আসলে কতটুকু সম্ভব জানি না। কারণ মধ্যবয়সে চলে এসেছি, কৃষক হওয়া তো শারীরিক সামর্থ্যেরও একটা ব্যাপার। এরপরও সব পরিকল্পনা, কাজ প্রায় শেষ। আমার স্বপ্নের একেবারে দ্বারপ্রান্তে আছি। ঢাকা শহরে আর থাকবোই না। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ঢাকায়; কিন্তু এখানে এখন আমার দম আটকে আসে। প্রকৃতির কাছাকাছি না, একেবারে প্রকৃতির ভেতরে চলে যাচ্ছি। বগুড়ায় আমার শ্বশুরবাড়ি, সেখানেই আমি অনেক আগে কিছু জায়গা কিনেছি। বিভিন্ন গাছপালা লাগিয়েছি, বাড়ি বানানোর কাজও শেষ প্রায়। আশা আছে এই শীতেই ঢাকা ছাড়বো, গ্রামে স্থায়ী হবো।
শহরেও তো আপনি কৃষির সঙ্গে যুক্ত…
তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমার বাসায় অনেক টব আছে। বিভিন্ন ফল, সবজির গাছ লাগিয়েছি। এমনকি শাপলা-পদ্মও আছে। আসলে আমি যে গাছই রোপণ করি, সেটাই হয়।
দীর্ঘদিন আপনার নতুন গান নেই, গান থেকে দূরে কেন? কনকচাঁপা বলেন, নিজে বিনিয়োগ করে আমি কখনোই গান করিনি। আমি একজন কণ্ঠশ্রমিক। আমাকে সংগীত পরিচালকেরা ডাকেন। আমি গান করি। আগে যাঁদের সঙ্গে গান করেছি, তাঁরা অনেকেই এখন আর নেই। জুনিয়র যাদের সঙ্গে গান করি, তারাও আগের মতো গান করে না। করলেও নতুনদের নিয়ে করে। আমি বিশ্বাস করি, সবার একটা সময় থাকে। আমি সেই সময় পার করে ফেলেছি। নতুনেরা আমাকে দিয়ে গান করাতে চায়, কিন্তু মনের ভেতর থেকে উৎসাহ পাই না। কদিন আগে একটি গান করতে গিয়ে পরে রেকর্ডিং স্টুডিও থেকে বের হয়ে আসি।
কখনো কি মনে হয়, পেশাদারত্ব আগের মতো নেই? তিনি বলেন, যারা নতুন, তারা কিন্তু আমার এ কথা বিশ্বাস করবে না। তারা তো ভালো করছে। কিন্তু তাদের কাছে আমার প্রত্যাশা কি দিন দিন বেশি হবে না? তা ছাড়া এখন তো আমি যা তা গাইব না। কানে লাগার মতো গান যদি না গাই, তাহলে শ্রোতা আমারই দোষ ধরে বলবেন, এত ভালো গান করতেন কনকচাঁপা, এখন কী গান গাইলেন! শিল্পীদের অবসর হয় না, কিন্তু জানা উচিত, কোথায় থামা দরকার। কেউ যেন না বলে, কী সুন্দর গলা, কী হয়ে গেছে। এই বিষয়েও আমি খেয়াল রাখি। আর আমার মনে হয়, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গান করে ফেলেছি।
