ইভ্যালির সিন্দুকে টাকা না পেয়ে বিস্মিত বিচারপতি মানিক

‘ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ধানমন্ডি কার্যালয়ের দুটি লকারের পাসওয়ার্ড না পেয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সোমবার (৩১ জানুয়ারি) ভাঙা হয়েছে সেই দুটি লকার। আপনারা সবাই দেখেছেন সেখানে কী কী পাওয়া গেছে।

আমরা অবশ্যই হতাশ। আমরা আশা করেছিলাম, এখানে অনেকগুলো টাকা পাওয়া যাবে। যেহেতু সিন্দুক, সিন্দুকে টাকাই থাকে। কিন্তু আমরা সেখানেই দুই হাজার ৫শ ৩০ টাকার মত পেয়েছি, সেই কারণেই আমরা হতাশ’।

সোমবার বিকেল ৫টার দিকে ইভ্যালির ধানমন্ডি কার্যালয়ের দুটি লকার ভাঙা শেষে সাংবাদিকদের হতাশার কথা জানান বোর্ড চেয়ারম্যান ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

সোমবার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ধানমন্ডি কার্যালয়ের ভাঙা হয় দুটি লকার। আদালতের নির্দেশনায় গঠিত বোর্ডের পাঁচ সদস্যই এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

তারা ভেবেছিলেন অনেক টাকা থাকবে। কিন্তু লকার ভাঙার পর দেখা যায়, দুই লকার মিলেছে দেড় শতাধিক বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই। প্রথম লকারে মেলেনি টাকা, দ্বিতীয় লকারে মিলেছে দুই হাজার পাঁচশ ৩০ টাকা।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলেন, ওপরে প্রথম লকার ভাঙা হয়। সেখানে আমরা পেয়েছি ১শ সাতটি চেকবই। সেখানে কোনো টাকা পাওয়া যায়নি। আর নিচতলার লকার ভাঙার পর সেখানে আমরা অনেকগুলো চেকবই পেয়েছি। যেগুলোর মধ্যে অনেকগুলো সই করা পেয়েছি। আর দুই হাজার ৫শ ৩০ টাকা পেয়েছি। কতগুলো ইনভেলাপে টাকা ছিল বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো ছেঁড়া। ধারণা করছি, সেখান থেকে টাকা বের করা হয়েছে। ভেবেছিলাম জরুরি প্রয়োজনে মেটাতেও অন্তত লকারে কিছু টাকা থাকবে। কিন্তু আমরা পায়নি। সে অর্থে আমরা নিরাশ হয়েছি।

ইভ্যালির টাকা পাচার হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বিচারপতি মানিক বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর যেসব তথ্য ও কাগজপত্রের মাধ্যমে ব্যাংকে যে পরিমাণ অর্থ থাকার কথা জেনেছি, আজকের চিত্র দেখে সে বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ইভ্যালির টাকা পাচার হয়েছে বা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছি।

অর্থপাচারের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা ক্লু পেয়ে এই সন্দেহ কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মোটামুটি আন্দাজ পেয়েছি। কারণ তথ্য-উপাত্ত ও কাগজপত্রে তাই মনে হচ্ছে। অর্থপাচার হয়েছে কি না সেটা আমরা জানার চেষ্টা করছি। অডিট করলে সেটি স্পষ্ট হবে। র‌্যাব ও সিআইডিও এ বিষয়ে কাজ করছে।

আর আমরা এই অফিসের ভবন মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি বলেছেন, ইভ্যালির রাসেল দম্পতি প্রায়ই দেশের বাইরে যেতেন, দুবাই যেতেন। সেটাও একটি কারণ হতে পারে।

ইভ্যালির কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে যে সমস্যায় পড়ছেন তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে বড় সমস্যা হলো, ইভ্যালির সার্ভারটি এখন বন্ধ রয়েছে। এই সার্ভারটি পরিচালনা করছে আমেরিকান ভিত্তিক কোম্পানি অ্যামাজনডটকম। তারা ইভ্যালির কাছে ছয় কোটি টাকা পায়। এই টাকা না দিলে তারা সার্ভার চালু করতে রাজি নয়।

‘কিন্তু সার্ভার ওপেন করা ছাড়া আমরা কিছু করতেও পারছি না। যখনই আমরা সার্ভার ওপেন করতে পারব, অ্যাকসেস পাব, তখনই ইভ্যালির সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারব। কারণ এই সার্ভার ছাড়া কে কত পান, কার কোন মাল, তা কোনোভাবেই চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না।’

বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখন অ্যামাজনডটকমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। তারা ভালো একটা রেসপন্স করেছে। তবে বলেছে সার্ভারে অ্যাকসেস পেতে হলে বোর্ডের এমডিকে আইডেন্টিফাই করতে হবে। এজন্য ইউএস অ্যাম্বাসেতি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিতে হবে।’

তিনি জানান, ইভ্যালির বিভিন্ন কার্যালয়ে হাজার-হাজার কাগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যেগুলো ছাড়া অডিট সম্পন্ন করাও সম্ভব না। এসব কাগজপত্র সংগ্রহ করবে অডিট ফার্ম। এ কাগজপত্র জোগাড় করতে অনেক সময় চলে যাবে।

বিচারপতি মানিক বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ও নির্দেশনা হাইকোর্ট যেটি দিয়েছে, তা হলো এই কোম্পানিকে দেউলিয়াত্বের দিকে নিয়ে যাওয়া। আইন হলো যখন একটি কোম্পানির দেউলিয়া হয়ে যায় তখন ওই কোম্পানির সম্পদ এবং দেনা সামঞ্জস্য করতে হবে। তারপর দায়-দেনার হিসাব করে যার যা পাওনা আছে তা পরিশোধ করা।

‘তবে হাইকোর্ট এটাও বলেছে যদি কোম্পানি বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি করা উচিত। তবে ইভ্যালির বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কি হবে সেটি এখনও আমরা নিশ্চিত হতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমরা সাউথইস্ট ব্যাংকে দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্ধান পেয়েছি এবং এই টাকাগুলো উত্তোলন করার অনুমতি চেয়েছি। আমরা যদি টাকা উত্তোলন করতে পারি তাহলে এর থেকে গ্রাহকদের কিছু টাকা ফেরত দিতে পারব।

‘এছাড়া আরও দুটি গেটওয়েতে ২৬ কোটি টাকা এবং আরও পাঁচ কোটি টাকা সন্ধান পেয়েছি। এর বাইরে সাভারের দুটি ওয়ারহাউজ এ ও বেশকিছু ইলেকট্রনিক্স আইটেম রয়েছে।’

ইভ্যালির সংকট উত্তরণ বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘কিন্তু সমস্যা হলো এই টাকা বা পণ্য পরিশোধ শুরু করা হলে তখন চারদিক থেকে গ্রাহকের ভিড় জমান শুরু হবে। সবাই আসবে আমার টাকা দেন আমার টাকা দেন। কিন্তু আমরা তো এখনই দিতে পারছি না কারণ সম্পদের দায়-দেনার হিসেবই আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। ’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *