মুখ খুললেন ইকবাল, প্রথম দিনই পাওয়া গেল চাঞ্চল্যকর তথ্য

নজর২৪ ডেস্ক- কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে রাতে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখেছিলেন ইকবাল হোসেন। দিনে তা নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তিনি সরাসরি মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরেও অংশ নেন। ১৩ অক্টোবর দিনে কুমিল্লায় বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন ইকবাল। সেই মিছিল থেকে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় মন্দিরে হামলা চলে সে সময়ও ভূমিকা রাখেন তিনি।

 

পুলিশের মারফত গণমাধ্যমের হাতে আসা আরেকটি নতুন ভিডিওতে ইকবালকে মন্দিরে আক্রমণকারীর ভূমিকায় দেখা যায়। তদন্তসংশ্নিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে এ তথ্য জানান।

 

কর্মকর্তারা জানান, মন্দিরে কোরআন শরিফ রাখার পরপরই ইকবাল পালিয়ে যাননি। গভীর রাতে মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর সকালে হামলার সময়ও তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে র‌্যাব-পুলিশের উপস্থিতি দেখে ভয়ে প্রথমে ট্রেনযোগে চট্টগ্রাম যান; সেখান থেকে বাসযোগে কক্সবাজারে চলে যান। সেখানে বেড়াতে যাওয়া তিন যুবক বৃহস্পতিবার সমুদ্রসৈকতে ইকবালকে উদভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। তার চেহারা তিন বন্ধুর চেনাচেনা লাগছিল। পরে তাদের মনে হয় ওই যুবকের চেহারার সঙ্গে কুমিল্লার মন্দিরে ঘটনায় অভিযুক্তের মিল রয়েছে। তাদের অনুসন্ধিৎসু মন আর সচেতনতায় গ্রেপ্তার হন ইকবাল।

 

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ইকবালকে কুমিল্লায় আনা হয়। গতকাল শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ), কুমিল্লা জেলা পুলিশ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশের বিশেষ শাখাসহ (এসবি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কয়েকটি ইউনিটের পক্ষ থেকে ইকবালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এটা এক ধরনের ‘যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ’।

 

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা জানান, নানুয়ার দীঘিরপাড়ে দর্পন সংঘের অস্থায়ী পূজাম পে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের মূর্তি থেকে গদা সরিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ইকবাল। তবে কার নির্দেশে তিনি কাজটি করেছেন, তা এখনও জানাননি। এ ব্যাপারে ইকবাল দাবি করেছেন, নিজে থেকেই তিনি মন্দিরে যান। সেখানে মূর্তি দেখে তার ভালো লাগেনি। তার মনে হয়েছে, মন্দিরে কোরআন শরিফ রাখলে সেখানে পূজা-অর্চনা হবে না। পূজায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করার জন্য এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন।

 

তবে ইকবালের এমন ‘সহজ স্বীকারোক্তি’কে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না তদন্তসংশ্নিষ্টরা। তারা বলছেন, ইকবালকে কেউ ব্যবহার করেছে। সেই নামটি হয়তো আড়াল করছেন তিনি।

 

তদন্তসংশ্নিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, কুমিল্লার ঘটনার এক দিন পর ১৪ অক্টোবর সকাল সোয়া ১০টার দিকে পুলিশ একটি সিসিটিভি ফুটেজ পায়। ওই ফুটেজে দেখা যায়, গদা হাতে একজন ঘোরাঘুরি করছেন। প্রথমে তদন্তসংশ্নিষ্টরা এটিকে লাঠি মনে করেছিলেন। পরে তারা গদা নিশ্চিত হওয়ার পর মন্দির ভাঙচুরের আগে-পরের একাধিক ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। এক পর্যায়ে তারা নিশ্চিত হন, ওই যুবক মন্দিরে ঢোকার পর থেকে গদা নেই। এরপর সিসিটিভির ফুটেজের ছবি দেখতে পাওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য এলাকার অনেকের কাছ থেকে তথ্য নেন। ১৪ অক্টোবর বিকেলেই পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত হয় সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায় যুবক নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুজানগরসংলগ্ন দ্বিতীয় মুরাদপুর লস্করপুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা নুর আহমেদ আলম পেশায় মাছ ব্যবসায়ী।

 

এ ছাড়া এলাকাবাসী পুলিশকে জানান, কুমিল্লায় মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরে ইকবালকে অংশ নিতে অনেকে দেখেছেন। এরপর আরেকটি ফুটেজ পুলিশের হাতে আসার পর সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

তদন্তসংশ্নিষ্ট আরেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট করেননি ইকবাল। কেন মন্দিরে কোরআন রাখার জন্য জনশূন্য এক রাতকে বেছে নেওয়া হলো, কেউ তাকে টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার করেছেন কিনা, দীর্ঘদিন ধরে কেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন না- এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি দেননি।

 

গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা মহানগরীর নানুয়া দিঘিরপাড় পূজামণ্ডপে কোরআন রাখা নিয়ে মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় ৯ মামলায় ৭৯১ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় পাঁচটি, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় দুটি এবং দাউদকান্দি ও দেবীদ্বার থানায় একটি করে মামলা হয়েছে। ৯১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলায় ৭০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *