নজর২৪ ডেস্ক- গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের মামলায় সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছেন ইভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কাছে টাকা পান এমন অধিকাংশ ভোক্তার প্রশ্ন তারা কী তাদের টাকা ফেরত পাবে না?
তাদের অধিকাংশই ১০০% অগ্রিম পেমেন্ট করা সত্ত্বেও পণ্য কিংবা টাকা কোনোটিই পাননি। বেশিরভাগ পঞ্জি স্কিমেই একবার টাকা চলে গেলে, সাধারণত তা পুনরুদ্ধার করা খুব কঠিন। কেননা এসব ক্ষেত্রে এই অর্থ হয় বিদেশে পাচার কিংবা খরচ হয়ে যায়।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বলছে, তারা এখনও ইভ্যালির অর্থ কোথায় গেছে তা জানতে পারেনি। এ বক্তব্যে গ্রাহকের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ইভ্যালির সাবেক কর্মচারীদের অভিযোগ, সংস্থাটি উপহার, ভ্রমণ, অনুষ্ঠান এবং স্পনসরশিপে প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করেছে। তারা জানায়, “ভবিষ্যতের চিন্তা না করেই অতিরিক্ত ব্যয় করত তারা। কেবল ব্র্যান্ডিং এবং কর্মীদের উৎসাহিত করতে গিয়েই বিশাল ক্ষতি করে ফেলেছে ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ।”
ইভ্যালির বিরুদ্ধে বিলাসবহুল ভ্রমণ, উপহারের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার অভিযোগ আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটি এত বেশি ব্যয় করে ফেলেছে, তারা আর কখনোই গ্রাহকদের থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত দিতে বা নিজেদের কর্মীদের বেতন দিতে পারবে না।
সম্প্রতি র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাসেল স্বীকার করেছেন নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে পুরনো গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের কৌশলটি খারাপ ছিল।
“প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল জানিয়েছে, ই-কমার্স ব্যবসার বিষয়ে সম্প্রতি প্রণীত সরকারী নিয়ম অনুসারে ইভ্যালির গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া কঠিন,” র্যাব মুখপাত্র জানান।
তিনি আরও বলেন, যদিও রাসেল কিছু বিদেশি কোম্পানির কাছে প্ল্যাটফর্মটি বিক্রি করার জন্য ইভালির ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, সরবরাহ শৃঙ্খলা বজায় না থাকা এবং ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় তাও হয়নি।
টাকা গেলো কোথায়?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাফিজুর রহমান বলেন, “টাকা ফেরত পাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এতে অনেক সময় এবং অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা লাগবে। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অতীতেও কয়েকটি এমএলএম কোম্পানি এভাবে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল, কিন্তু বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই তাদের টাকা ফেরত পায়নি।”
ইনভেস্টোপিডিয়ার মতে, পঞ্জি স্কিমের মতোই-একটি প্রতারণামূলক বিনিয়োগ সংস্থা বিনিয়োগকারীদের সামান্য ঝুঁকি নিয়ে উচ্চ হারের হারের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরা ভোক্তাদের সব ধরণের লাভজনক “ডিল” অফার করে, যার মধ্যে ১০০% থেকে ১৫০% পর্যন্ত ক্যাশব্যাক অফার, প্রচুর ছাড়, উপহার কার্ড এবং আরও অনেক অফার রয়েছে যা প্ল্যাটফর্মটি থেকে কেনাকাটা করাকে খুব আকর্ষণীয় করে তোলে।
এক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকি হলো, ইভ্যালি গ্রাহকদের পণ্য ডেলিভারিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নিয়ে থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে যা ৪৫ দিন। খুব তাড়াতাড়ি সরবরাহ করা পণ্যের অভিযোগ আসতে শুরু করে।
জানা গেছে, ইভালির বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছে ৫ হাজারেরও বেশি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর অধিকাংশই “সম্পূর্ণ অর্থ প্রদান করেও দীর্ঘদিন পণ্য না পাওয়ার জন্য” দায়ের করা হয়েছিল। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক ইভ্যালির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগও এনেছে।
মিফতা জামান নামে বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, তীব্র প্রয়োজন তাকে এ বছরের জানুয়ারিতে ইভ্যালি থেকে মোটরসাইকেল অর্ডার করতে বাধ্য করেছিল। যেখানে কোম্পানির মালিকরাই কারাগারের পিছনে সেখানে ২০ সেপ্টেম্বর তিনি পণ্যের অবস্থা মুলতবি দেখতে পান।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মোটরসাইকেল অথবা অগ্রিম দেওয়া অর্থ কোনোটাই পাওয়ার উপায় নেই। একই সঙ্গে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব নয়। যদি আমি মামলা করি, তারা অবশ্যই আমাকে বাইক সরবরাহ করবে না।
রাশিদুল হাসান প্রীতম নামে আরেক গ্রাহক, বিতর্কিত এই প্ল্যাটফর্মটি থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার পণ্য নিয়েছেন, যেগুলো এখনো ডেলিভারি পাননি।
তিনি বলেন, “৪৫ দিন পর আমি তাদের অফিসে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছিল কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ডেলিভারিতে সময় লাগবে।” অন্যদিকে, ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রাসেলের মুক্তি দাবি করছে, যাতে তিনি তাদের পাওনা পরিশোধ করতে পারেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্ষুব্ধ গ্রাহক বলেন, “আমি চাই রাসেল ভাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হোক। যদি সে ফিরে আসে, হয়ত গ্রাহকরা তাদের পণ্য বা অর্থ ফেরত পাবে। অন্যথায়, এটা সম্ভব নয়। আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি এই বিষয়টিকে সূক্ষ্মভাবে পরিচালনা করার জন্য। আমার ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ ইভ্যালির কাছে আটকে আছে।”
“আরও অনেক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম একই ধরনের কাজ করেছে কিন্তু সেগুলো এখনও চালু আছে। আমি আশা করি কর্তৃপক্ষ তার গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়ার জন্য হলেও রাসেলকে ছেড়ে দেবে,” তিনি যোগ করেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম বলেন, “মানুষ তখনই তাদের টাকা বা পণ্য পাবে যখন ইভ্যালির টাকা দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু এই মুহূর্তে ইভ্যালির সেই ক্ষমতা নেই। কার্যকরী মূলধনের অভাবে, ইভ্যালি গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করতে কোনোদিন সক্ষম হবে এমন কোনো সম্ভাবনাও নেই।”
রাসেল এখনও নিজেকে নিরপরাধ ভাবেন
পুলিশ ইভ্যালির মামলা তদন্তে করতে গিয়ে রাসেল ও নাসরিনকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পুলিশ যা জানতে চেয়েছে, রাসেল কোনও না কোনও উত্তর দিয়েছেন। রাসেল পুলিশকে বলেন, ‘আমি গতানুগতিক ব্যবসার বাইরে গিয়ে বেশি ছাড়ে পণ্য বিক্রি করেছি। অফার দিয়েছি। এর বাইরে কোনও অপরাধ করিনি।’
রাসেল ও নাসরিনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদও করেছে পুলিশ। এ সময় দুজনই ইভ্যালির বিষয়ে নিজেদের নিরপরাধ দাবি করেন। তারা বলেন, তারা ইভ্যালির অর্থ নয়ছয় করেননি। লস দিয়ে পণ্য বিক্রির এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে ব্র্যান্ড তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার বিক্রি করে তা পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
ইভ্যালির সম্পদ কত?
গত তিন বছরে কী পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছে ইভ্যালি তার নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এখনও হিসাব করছেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও রাসেল বা নাসরিন সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি। দেশে বা দেশের বাইরে কোনও সম্পদ গড়েছেন কিনা তাও জানা যায়নি।
